দেশের মোবাইল আর্থিক সেবাখাতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে থাকা ‘নগদ’-এ বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ঢাকা-১৪ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। এ নিয়ে আর্থিক খাত ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক এবং পরবর্তীতে পাঠানো চিঠিতে তিনি ‘নগদ ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস’-এ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিটেরও অনুরোধ জানিয়েছেন।
৮ ফেব্রুয়ারি গভর্নর বরাবর পাঠানো চিঠিতে ব্যারিস্টার আরমান উল্লেখ করেন, তার অনুরোধেই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স, বিনিয়োগ সম্ভাবনা ও নগদের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, তার সঙ্গে কয়েকটি দেশী-বিদেশী বহুজাতিক বিনিয়োগ সংস্থা যুক্ত রয়েছে, যারা বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক খাতে অংশ নিতে আগ্রহী।
চিঠিতে তিনি দাবি করেন, নগদ বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে এটি নতুন মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি বৈঠকে জেনেছেন। এমন সুযোগ পেলে তা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে ‘ডিউ ডিলিজেন্স’ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট পরিচালনার অনুমতি চেয়ে গভর্নরের সহযোগিতা কামনা করেন।
২০১৯ সালের ২৬ মার্চ যাত্রা শুরু করা নগদ প্রথমে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সেবা হিসেবে পরিচিতি পেলেও পরবর্তীতে এর মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক লাইসেন্স ছাড়া এবং প্রচলিত নীতিমালা উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক নগদের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করে। বিশেষ নিরীক্ষায় ভুয়া পরিবেশক ও এজেন্ট দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, অতিরিক্ত ই-মানি সৃষ্টি এবং বিপুল অঙ্কের আর্থিক গরমিলের তথ্য সামনে আসে। প্রায় ২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার হিসাব না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তদন্ত চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নগদের মালিকানা হস্তান্তর করতে হলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করতে হবে। সরাসরি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তরের সুযোগ নেই। আরও জানা গেছে, ‘নগদ লিমিটেড’-এর শেয়ার এখনো আগের মালিকানার অধীন। ফলে সরকারের পূর্ণ মালিকানা নিশ্চিত না হলে তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর সম্ভব নয়।
এই প্রেক্ষাপটে ব্যারিস্টার আরমানের আগ্রহকে অনেকে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
নগদের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে বলে আর্থিক বিশ্লেষকদের ধারণা। অন্যদিকে নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী ব্যারিস্টার আরমানের ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি টাকা। ফলে তিনি নিজে বিনিয়োগ করবেন, নাকি কেবল বিদেশী বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধিত্ব করছেন—এ প্রশ্ন উঠেছে।
ব্যারিস্টার আরমান দাবি করেছেন, তিনি বহুজাতিক বিনিয়োগ সংস্থার স্থানীয় সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন। দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিদেশী বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি বলেও তিনি মত দেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভালো বিনিয়োগকারী পেলে নগদকে নতুনভাবে দাঁড় করানো সম্ভব।
অর্থনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এত বড় অঙ্কের বিনিয়োগে অর্থের উৎস, আইনি কাঠামো এবং স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একজন সংসদ সদস্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এমন বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলে স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest) আছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
নগদ বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৪০০ কোটি টাকার লেনদেন পরিচালনা করছে। জানুয়ারি মাসে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাজারে উল্লেখযোগ্য অংশীদারিত্ব থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত বাজারমূল্য এখনো নির্ধারিত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ফরেনসিক নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছে বলে জানা গেছে।
ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে। ২০১৬ সালে গুম হওয়ার পর দীর্ঘ আট বছর বন্দিদশায় থাকার দাবি রয়েছে তার। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি মুক্তি পান এবং পরবর্তীতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে গভর্নরের কাছে বিনিয়োগসংক্রান্ত চিঠি পাঠানো নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
নগদের মতো বড় ও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের আগ্রহ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে মালিকানা কাঠামো, চলমান মামলা, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি অনিশ্চয়তায় রয়ে গেছে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে নগদের ভবিষ্যৎ মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা।