ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে কেবল একটি সাধারণ ভাতা হিসেবে না দেখে, একে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের মেয়াদ শেষ হলেও দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা দূর করার চ্যালেঞ্জ আগের চেয়ে বেড়েছে। তাই খণ্ডিত কর্মসূচির পরিবর্তে একটি সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডের একটি হোটেলে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধিকে ফ্যামিলি কার্ড কীভাবে আরও বিস্তৃত করতে পারে’ শীর্ষক এই বৈঠকের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক গ্রোথ সেন্টার (আইজিসি) এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা, সুবিধাভোগী নির্বাচনে ভুল এবং সহায়তার প্রকৃত মূল্য কমে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো দীর্ঘদিনের। বর্তমান আর্থিক চাপের মধ্যেও সরকার ৪১ লাখ পরিবারের জন্য ১৪ হাজার কোটি টাকার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে। তিনি এটিকে কেবল ব্যয় হিসেবে না দেখে বরং মানবসম্পদে বিনিয়োগ হিসেবে অভিহিত করেন, যা মানুষের ভোগক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
‘এক নাগরিক, এক কার্ড’ ধারণা বাস্তবায়নের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, বিভিন্ন দপ্তরের তথ্যভান্ডার একীভূত করার চেয়ে তাদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সক্ষমতা বাড়ানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসংস্থান, রাজস্ব ও স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিজ নিজ তথ্যভান্ডার বজায় রাখবে, তবে তাদের মধ্যে নির্ভুল ও কার্যকর তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সুবিধাভোগী নির্বাচনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সহায়তায় দারিদ্র্য নির্ধারণ পদ্ধতি হালনাগাদ করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার পরবর্তী ধাপে পরিবারভিত্তিক সহায়তার পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি, মৌসুমি অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং বেকারত্ব-সংক্রান্ত সহায়তাকে একই কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। উপদেষ্টা জানান, পরবর্তী বাজেট থেকেই একটি দক্ষ ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নাগরিক সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে সুস্পষ্ট প্রস্তাব প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক সুরক্ষা সংস্কার কেবল প্রযুক্তিগত নয়, এটি একটি সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠার অংশ। গণতান্ত্রিক মানবকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। নাগরিক সমাজ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব, যা সংবিধানে স্বীকৃত সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার লক্ষ্য পূরণ করবে।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইজিডি-এর নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন। ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টারের কান্ট্রি ইকোনমিস্ট আমিনুল আমানের সঞ্চালনায় এতে স্বাগত বক্তব্য দেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক অতনু রব্বানীসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।



