ফটিকছড়িতে হেফাজত আমীরের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ, ৯ দফা দাবি পেশ

, Uncategorized

ফটিকছড়িতে হেফাজত আমীরের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ, ৯ দফা দাবি পেশ

চট্টগ্রাম সফরে এসে ফটিকছড়িতে হেফাজত আমীর আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী ফটিকছড়ির আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় পৌঁছালে হেফাজত আমীর তাকে স্বাগত জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে ধরেন হেফাজত আমীর; তৈরি হয় এক আবেগঘন মুহূর্ত। পরে হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৯ দফা দাবি জানান হেফাজত নেতারা। গতকাল বিকালে হেলিকপ্টারে করে ফটিকছড়ির পেহেলগাজী দীঘির মাঠে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে স্থানীয় সাধারণ মানুষ তাকে অভ্যর্থনা জানান। প্রধানমন্ত্রী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন।

বৈঠক শেষে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বক্তব্য দেন। ওই সময় তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে আমি হুজুরকে কথা দিয়েছিলাম, আমি আসবো। সরকার গঠন করার একদিন পরই রোজা শুরু হয়েছে। ‘ফ্যাসিবাদের মাথা’ হয়তো পালিয়ে গেছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদের তো অনেক কিছু রয়ে গিয়েছিল। রোজার সময় কেউ কেউ সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করেছে। গত রমজানে আমরা সক্ষম ছিলাম। বিগত নির্বাচনের সময় আমরা একসঙ্গে থেকে কাজ করে দেশকে বিপদের হাত থেকে মুক্ত করেছি। আপনাদের যারা আছেন, সহকর্মীবৃন্দ, তারা কাজ করেছেন। ফলে আমরা দেশকে একটা বিপদ থেকে রক্ষা করতে পেরেছি। তবে একটা জিনিস আমি বলবো, সমস্যাটা শেষ হয়ে যায়নি। বিগত ফ্যাসিবাদের সময় আপনারা দেখেছেন, কীভাবে দেশের মানুষের অর্থসম্পদ লুটপাট করে এই দেশ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “খেয়াল করে দেখবেন কয়েক দিন ধরে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে, বিশৃঙ্খলা তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেজন্য বলছি, আমরা নির্বাচনের আগে যেভাবে একসঙ্গে কাজ করেছি, আগামী দিনগুলোতেও একসঙ্গে থাকতে চাই। আপনারা যে দাবি উপস্থাপন করেছেন, আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করবো।” প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি ও পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর ও গিয়াস কাদের চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

৯ দফা দাবির বিষয়ে হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজেদুর রহমানের সই করা লিখিত দাবিতে প্রথমেই মহান আল্লাহ, রাসুল (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাসের দাবি জানানো হয়। একইসঙ্গে কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণয়ন না করার আহ্বান জানানো হয়। কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করে শিক্ষার্থীদের জন্য দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে হেফাজত। বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি মাদ্রাসার ডিগ্রির পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের ডিগ্রি শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়।

এ ছাড়া কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা এবং হিযবুত তওহিদকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিগুলোর ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধের দাবিও রয়েছে তাদের। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে আলেমদের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করে এ দেশের আলেম-ওলামাকে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে অংশীদার করার দাবিও জানানো হয়। হেফাজত নেতারা আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের এই যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবেন।

হেফাজত আমীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে ফটিকছড়ি থেকে হাটহাজারীতে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও আল্লামা জোনায়েদ বাবুনগরীর কবর জিয়ারত করেন তিনি। এর আগে দুপুরে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য নতুন বাসগৃহ নির্মাণ কর্মসূচির আওতায় বাঁশখালীর বাহারছড়া গ্রামের একটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে নতুন বাড়ির চাবি হস্তান্তর করেন। নতুন বাড়ির আঙিনায় একটি মেহগনি গাছের চারাও রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বাঁশখালীর সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী সংসদে সরকারের পরিকল্পনা উপস্থাপনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, “যার ফলে লবণ চাষি ভাইদের আর আগের মতো কষ্ট পোহাতে হবে না।” চট্টগ্রামকে অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজ সকালে আমি মাতারবাড়ীসহ চট্টগ্রামের মহেশখালী ও মীরসরাই অঞ্চল পরিদর্শন করেছি। স্বাস্থ্যসেবা খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে থাকা ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে, যাতে তৃণমূলের মানুষ পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা পান।” সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে চট্টগ্রামের নেতৃত্বের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “যে অঞ্চলের দুইজন ব্যক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ দু’টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, সেই এলাকার উন্নয়ন কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ।”

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিগত কিছুদিন ধরে কিছু মানুষ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, “আর পিছনে পড়ে থাকা যাবে না। এখন কাজ করার, দেশ গড়ার সময়।” দিনব্যাপী চট্টগ্রাম সফরের অংশ হিসেবে তিনি চট্টগ্রাম বিএনপি’র নেতাকর্মীদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন এবং স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা যেন দেশের মানুষের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারি, ভালো কিছু করতে পারি, সেজন্য আপনাদের সবার কাছে দোয়া চেয়েছি।”

কিন্তু রোজা শেষ হতে না হতেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সমস্যা শুরু হয়ে গেল।

ফলে তেল-জ্বালানিসহ বিভিন্ন বিষয়ের পুরো অর্থনীতির ওপর একটা চাপ তৈরি হলো।”

ফ্যাসিবাদের সময় পরিকল্পনাহীনভাবে যে কাজগুলো করা হয়েছে, তার খেসারত এই দেশের মানুষকে দিতে হচ্ছে।”

দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ই মে শাপলা চত্বরে রাতের আঁধারে সংঘটিত নৃশংস গণহত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

একইসঙ্গে ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাযজ্ঞে জড়িত, হুকুমের আসামি ও খুনিদের বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমে বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়।

শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।

একইসঙ্গে টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থিদের ইজতেমা বন্ধের দাবি করা হয়।

এ ছাড়াও আল্লামা মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে তিনটি দাবি করা হয়।

সেগুলো হলো- উত্তর চট্টগ্রামে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নিত করা ও ফটিকছড়িতে একটি বিদ্যুৎ সাবস্টেশন নির্মাণ।

এর আগে সকালে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শন করেন তিনি।

গতকাল চট্টগ্রামের বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে চট্টগ্রাম জেলার সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আয়োজিত ‘গৃহ হস্তান্তর, অনুদান ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিরোধী দল বা অন্য কারও যদি কোনো পরিকল্পনা থাকে, তা জনগণের সামনে উপস্থাপন করুন।

দেশের প্রতিটি পরিবারের সার্বিক কল্যাণ ও সামাজিক সুরক্ষার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণ আমাদের নির্বাচিত করেছে, তাই সরকারের মূল দায়িত্ব হলো জনগণের পাশে থাকা।

সুখে-দুঃখে দেশের মানুষের পাশে থাকা, মা-বোনদের পাশে থাকা, দেশের সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা, অসুস্থ মানুষদের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তরুণ-যুব সমাজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।’

ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে এবং চলতি মাসের ১৬ তারিখ থেকে মূল কাজ শুরু হতে যাচ্ছে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের প্রধান নারীদের হাতে এই কার্ড তুলে দেয়া হবে।

বাঁশখালী উপজেলাতেও প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মা-বোনদের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষকদের জন্যও চালু করা হচ্ছে কৃষক কার্ড, যা সাধারণ কৃষকের পাশাপাশি লবণ চাষিরাও পাবেন।

লবণ চাষিদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরাতে লবণের নতুন মূল্য নির্ধারণের ঘোষণাও শিগগিরই দেয়া হবে।

সমপ্রতি চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অঞ্চলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে বহু শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে এবং হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

দুইটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছি- একটি অর্থ মন্ত্রণালয়, আরেকটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এখন একটি লক্ষ্য, একটি উদ্দেশ্য, তা হলো জনগণের জীবনমান উন্নত করা।

কারণ আমরা সবসময় বলি, বিএনপি’র সকল ক্ষমতার উৎস হচ্ছে জনগণ।

জনগণের সমর্থন থাকলে আমরা জনগণের স্বার্থে যতগুলো কর্মসূচি নিয়েছি সবগুলো বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবো।’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং ত্রাণ ও দুর্যোগমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।

পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও হাঁস-মুরগি প্রদান করেন তিনি।