বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ও অবিস্মরণীয় নাম বেগম খালেদা জিয়া। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান তিনি। শনিবার (১৫ আগস্ট) বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। বিএনপির চেয়ারপার্সন এবং দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত বছর ৩০ ডিসেম্বর ৮০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গড়া মা, মাটি ও মানুষের রাজনৈতিক দল হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে সুদৃঢ় সাংগঠনিক কাঠামো ও জনপ্রিয়তার শেকড়ে পৌঁছে। একনায়কতন্ত্র, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের প্রশ্নে তিনি ‘আপসহীন’ নেত্রীর উপাধি পান। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে নানা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও সংকটের মুখে বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় নেতৃত্বে ফিনিক্স পাখির মতো ফের ঘুরে দাঁড়িয়ে দলটি তার গ্রহণযোগ্যতা, জনপ্রিয়তা ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা বার বার প্রমাণিত হয়েছে। তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন, যা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজায় পরিণত হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শনিবার তার অনুপস্থিতিতে প্রথম জন্মদিন শোক, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়ায় তাকে স্মরণ করবেন বিএনপির অগণিত নেতা-কর্মীসহ দেশবাসী। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান একটি স্বাধীন দেশ হলে তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার দিনাজপুরে চলে আসেন। পরবর্তীকালে তিনি দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার শৈশব ও শিক্ষা জীবন কাটে দিনাজপুরে। পাঁচ বছর বয়সে খালেদা খানম পুতুলকে তার বাবা দিনাজপুরে নিয়ে আসেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ফেনী জেলার বর্তমান পরশুরাম উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রেড এইটের ছাত্র ইস্কান্দার মজুমদার ১৯১৯ সালে তার বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে জলপাইগুড়িতে থাকতে গিয়েছিলেন। এই পরিবার ‘টি-ফ্যামিলি’ নামে পরিচিত। এই দম্পতির তিন মেয়ে ও দুই ছেলে, যাদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া তৃতীয়।
দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় পিত্রালয়ে ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা খানমের বিয়ে হয়। জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া তাদের দাম্পত্য জীবনের প্রথম চার বছর দিনাজপুরে কাটিয়েছিলেন। ১৯৬৫ সালে স্বামীর পোস্টিং পাকিস্তান হওয়ায় বেগম খালেদা জিয়া সেখানে বসবাস করেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরুতে মেজর জিয়াকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়।
ঢাকায় স্বজন ও পরিচিতজনদের বাসায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ১৯৭১ সালের ২ জুলাই সিদ্ধেশ্বরীর একটি বাসা থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা হানাদারমুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সেনা হেফাজতে ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী চৌকস সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হয়েও তিনি সাধারণ বাঙালি গৃহবধূর মতো জীবনযাপন করতেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাতে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর ১ জুন সকালে খালেদা জিয়া স্বামীর নির্মম হত্যার খবর পান। ৩ জুন স্বামীর কবরে গেলে মাজার প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার মৃত্যুর পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে বিএনপি সংকটের মুখে পড়ে। এরশাদ বিএনপির অভ্যন্তরে ভাঙন ধরানোর জন্য একের পর এক প্রচেষ্টা চালান। তখন অনেকটা আকস্মিকভাবেই রাজনীতিতে এলেন বেগম খালেদা জিয়া। দলে দায়িত্ব নিয়ে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে গঠিত সাত দলীয় জোটের মাধ্যমে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতনে তার নেতৃত্ব ছিল অবিস্মরণীয়। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। ১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তার প্রথম মেয়াদে (১৯৯১-৯৫) সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণ এবং গঙ্গার পানিবণ্টন ইস্যু জাতিসংঘে উত্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জিত হয়।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৯ সালে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের সমন্বয়ে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে এই জোট বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং বেগম খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় নেতৃত্বের পর দলের হাল ধরেছেন তার জেষ্ঠ্য পুত্র তারেক রহমান। তিনি দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই উৎরাই, নির্যাতন ও দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন পার করেছেন তারেক রহমান। নির্বাসিত জীবন কাটিয়েও তিনি দলের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করেছেন। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।
২০ বছর পর আবারও জনগণের বিপুল সমর্থন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এই স্লোগানকে ধারণ করে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি শেখ হাসিনা সব বিরোধী দলকে বাইরে রেখে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে চাকরিতে কোটা ইস্যুকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে তার টানা সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়। শেখ হাসিনার সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিতর্কিত অনেক কর্মকর্তা ৫ আগস্ট-এর আগে ও পরে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরেই আজকের এই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে।
বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন ব্যক্তি নন, নিজ কর্মগুণে নিজেকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।
এরপর দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন।
১৯৬৩ সালে এ কলেজ থেকে বেগম খালেদা জিয়া ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
ব্যবসার উন্নতি লাভের আশায় ইস্কান্দার মজুমদার দিনাজপুরে এসেছিলেন।
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টির পর তিনি দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
বর্তমানে জলপাইগুড়ি ভারতের অন্তর্ভুক্ত।
একপর্যায়ে তিনি জলপাইগুড়ির ‘চা বাগান সমিতি’র সম্পাদক নির্বাচিত হন।
সেখানে ১৯৩৭ সালের ১৯ মার্চ তার সঙ্গে তৈয়বার বিয়ে হয়।
তৈয়বা বর্তমান পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ীর বাসিন্দা।
তিনি তার দিনাজপুরের বাড়িতে দুস্থ মহিলাদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিচালনা করতেন।
বেগম খালেদা জিয়া বিয়ের পর জিয়াউর রহমানের গ্রামের বাড়ি বগুড়ার বাগবাড়িতেও থেকেছেন।
বিয়ের পর তিনি স্বামীর কর্মক্ষেত্রের কারণে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেন।
ছোট সন্তান আরাফাত রহমান কোকো, যার জন্ম ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট, যিনি ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি ব্যবসার পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
মূলত দুই পুত্রকে লালন পালন ও ঘরের কাজ করেই সময় কাটাতেন বেগম জিয়া।
মেজর জিয়া ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন।
তাকে জয়দেবপুর সাব ক্যান্টনমেন্টে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দ্বিতীয় ব্যাটালিয়নে সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ওই বছরই চারমাসের প্রশিক্ষণে তাকে পশ্চিম জার্মানি পাঠানো হয়।
জিয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আগ্রাসী দমননীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।
প্রথমবারের মতো স্থানীয় রেডিও স্টেশন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতে নিজের পরিবারকে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে জিয়াকে এগিয়ে যেতে হয়।
তখন তিনি চট্টগ্রামের বাইরে কোথাও সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তার বড় বোন খুরশিদ জাহান হকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৭১ সালের ১৬ মে সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থেকে লঞ্চে করে নারায়ণগঞ্জে পৌঁছান।
বোরকা পরিহিত অবস্থায় দুই সন্তানকে নিয়ে সেদিন নারায়ণগঞ্জে পৌঁছান বেগম খালেদা জিয়া।
গ্রেফতার করে দুই ছেলেসহ তাকে পুরোনো সংসদ ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়।
এটি সামরিক আইন প্রশাসনের কর্মক্ষেত্রও ছিল।
বন্দি অবস্থায় তিনি সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি সামলে চলেন।
সংকটময় মুহূর্তে তিনি সবসময় নিজেকে ধীরস্থির রেখেছিলেন এবং ভেঙে না পড়ে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সংকল্পবদ্ধ ছিলেন।
এ সময় তার সঙ্গী থাকতো বই ও পত্র-পত্রিকা।
জিয়া এলে একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে যেতেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাত ১০ টায় জিয়া চট্টগ্রাম থেকে বাসায় বেগম খালেদা জিয়াকে ফোন করেন।
কিন্তু সেটাই ছিল খালেদা জিয়ার কাছে জিয়ার জীবনের শেষ ফোন।
সেই সঙ্গে দীর্ঘ একুশ বছরের তাদের মধুর দাম্পত্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
লাখো লাখো মানুষের মাতম আর আহাজারিতে শহীদ জিয়াকে সমাহিত করা হয় সংসদ ভবনের উত্তর পাশে ক্রিসেন্ট লেকের পাড়ে।
১৯৮১ সালের জুন মাসের শেষের দিকে টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারে বেগম খালেদা জিয়া বর্ণনা করেছিলেন স্বামীর অনাড়ম্বর ও সরল সংসারের চিত্র।
রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা তো দূরের কথা, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানেও তাকে খুব একটা দেখা যেত না।
তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক ফরমান জারি করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন।
একদিকে দলীয় কোন্দল, অন্যদিকে বিএনপির অনেক নেতার এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগদান- এই দুই পরিস্থিতিতে বিএনপি তখন অনেকটা ছত্রভঙ্গ, বিপর্যস্ত এবং দিশেহারা।
রাজনীতিতে আসার তার কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না।
বিএনপির নেতাদের পরামর্শ ও অনুরোধে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন।
১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ার কঠোর সিদ্ধান্ত এবং এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তাকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কয়েকবার আটক করে তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার।
আন্দোলন দিনে দিনে বেগবান হতে শুরু করে।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের দূরদর্শিতায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ৩২১টির মধ্যে ২৭০টি ছাত্র সংসদে বিজয় লাভ করে, যা গণআন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে।
এতে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন বেগম খালেদা জিয়া।
তার সরকার দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠা করে।
তিনি ২ এপ্রিল সংসদে সরকারের পক্ষে এই বিল উত্থাপন করেন।
একই দিন তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে স্বপদে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে একাদশ সংশোধনী বিল আনেন।
১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে দুটি বিল পাশ হয়।
তার প্রথম মেয়াদেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসার, নারীর কর্মসংস্থানে অগ্রগতি এবং অর্থনীতির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়।
তৈরি পোশাক খাতে পাঁচ বছরে কর্মসংস্থান ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং প্রায় দুই লাখ নারী নতুনভাবে যুক্ত হন।
তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানিবণ্টন ইস্যু উত্থাপন করেন, যার ফলে বাংলাদেশের ন্যায্য অংশ পাওয়া নিশ্চিত করার উদ্যোগ জোরদার হয়।
১৯৯২ সালে হোয়াইট হাউস সফরে তিনি রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরেন।
পরবর্তী সময়ে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে।
কারণ পঞ্চম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নানা ইস্যুকে সামনে এনে টানা ১৭৩ দিন হরতাল পালন করে।
এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যগণ পদত্যাগ করেন।
ষষ্ঠ সংসদে বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিল পাশ হয়।
সে নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও এককভাবে ১১৬টি আসন পেয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করে।
নারী শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সংস্কারে তার সরকার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে।
২০০৫ সালে নারীর ক্ষমতায়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ফোর্বস ম্যাগাজিনে বিশ্বের ক্ষমতাশালী নারীদের তালিকায় তিনি ২৯তম স্থান পান।
তার সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, উপবৃত্তি ও খাদ্য সহায়তা, সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধিসহ নানা যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
পরীক্ষায় নকল দমনেও তার সরকারের সফলতা প্রশংসিত হয়।
সংবিধান অনুযায়ী ২০০৬ সালের নভেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন বেগম খালেদা জিয়া।
ওই সরকার ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে তফসিল ঘোষণা করেছিল।
সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করে।
একপর্যায়ে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।
২২ জানুয়ারি নির্বাচনের তফসিল স্থগিত করা হয়।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় আসে ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
তাদের নানা কর্মকাণ্ড বিশেষ করে রাজনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার তৎপরতা তখন দৃশ্যমান হয়েছিল।
এক-এগারোর সরকার বড় আঘাত হানে বিএনপির ওপর।
এ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আব্দুল মান্নান ভূঁইয়াকে দল থেকে বহিষ্কার করে দলের প্রবীণ নেতা খন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসা থেকে বেগম খালেদা জিয়া ও তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেফতার করা হয়।
এর আগে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ বেগম খালেদা জিয়ার জেষ্ঠ্যপুত্র ও বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান গ্রেফতার হন।
বেগম খালেদা জিয়াকে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি দেওয়া হয়।
তারেক রহমানকে মুক্তি দেওয়া হয় ৩ সেপ্টেম্বর।
গ্রেফতারের পর যৌথবাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো।
কারামুক্তির পর তারেক রহমানকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন ও আরাফাত রহমান কোকোকে থাইল্যান্ড পাঠানো হয়।
পরবর্তী সময়ে আরাফাত রহমান কোকো মালয়েশিয়ায় থাকতেন।
সেখানে অসুস্থ হয়ে ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন তিনি।



