ব্রিটেন কি সত্যিই ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ হয়ে উঠছে? নেতানিয়াহুর মন্তব্যের আড়ালে রাজনীতির সমীকরণ

, বিশ্ব

ব্রিটেন কি সত্যিই ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ হয়ে উঠছে? নেতানিয়াহুর মন্তব্যের আড়ালে রাজনীতির সমীকরণ

সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার দেশের অন্যতম দীর্ঘদিনের মিত্র ব্রিটেন সম্পর্কে একটি চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন। ইসরায়েলি আর্মি রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ব্রিটেনকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ ব্রিটেন’ এবং দেশটিকে ‘পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনকারী প্রথম ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। নেতানিয়াহুর এই মন্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল একটি সতর্কবার্তা দেওয়া, তবে এটি ব্রিটেনের প্রকৃত পরিস্থিতির চেয়ে বরং তার নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই বেশি প্রতিফলিত করে।

ব্রিটেন একটি বৈচিত্র্যময় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ছয় শতাংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস, নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং জনজীবনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা ব্রিটেনের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। তবে মুসলিম-বিরোধী রাজনীতির ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক দৃশ্যমানতাকে প্রায়ই ‘ইসলামীকরণ’ বা ‘অনুপ্রবেশ’ হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। এই অদ্ভুত যুক্তির সারমর্ম হলো, কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মুসলমানরা যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়ে উঠলে সেই রাষ্ট্রটিই যেন মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

এই ধরনের আতঙ্কের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে এক ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণ লক্ষ্য করা যায়। ব্রিটেনে সম্প্রতি ঋষি সুনাকের মতো একজন প্র্যাক্টিসিং হিন্দু প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু তখন নেতানিয়াহু বা তার মিত্রদের পক্ষ থেকে ব্রিটেনকে ‘হিন্দুকরণ’ বা ‘হিন্দু প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার কোনো প্রবণতা দেখা যায়নি। একইভাবে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের স্ত্রী ও সন্তানরা ইহুদি ঐতিহ্যের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও ‘ব্রিটেনের ইহুদিকরণ’ নিয়ে কোনো জল্পনা শোনা যায়নি। এমনকি ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের নেতৃত্ব নিয়েও কোনো বিতর্ক তৈরি হয়নি। অথচ মুসলিমরা রাজনীতি বা পেশাগত ক্ষেত্রে সফল হলেই তাকে ‘ইসলামীকরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলে।

বাস্তবতা হলো, ব্রিটেনে প্রায় চল্লিশ লাখ মুসলিম বসবাস করেন, যা একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু অংশ। সেখানে কোনো ইসলামিক রাষ্ট্র বা খিলাফত প্রতিষ্ঠার মতো উল্লেখযোগ্য কোনো আন্দোলন নেই। ব্রিটিশ রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংসদ এবং আইন সম্পূর্ণ অটুট রয়েছে। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে প্রায় ১৩,০০০ মুসলিম ডাক্তার কর্মরত ছিলেন, যা মোট চিকিৎসকদের প্রায় ১০ শতাংশ—অর্থাৎ জনসংখ্যার অনুপাতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তারা নির্বাচনে ভোট দেন এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ইংরেজিকে প্রথম ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের এই অংশগ্রহণকে দখলদারিত্ব হিসেবে চিত্রিত করা নাগরিকত্ব ও বিজয়ের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরির শামিল।

ইউরোপের ইতিহাসে ইসলাম কোনো নতুন বিষয় নয়। সহস্রাধিক বছর ধরে যুদ্ধ, বাণিজ্য, কূটনীতি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে ইউরোপ ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে গভীর যোগাযোগ বিদ্যমান। আল-আন্দালুসের মুসলিম সভ্যতা থেকে শুরু করে অটোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব—ইসলাম ইউরোপের আত্মপরিচয় নির্ধারণে সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত ইউরোপ পুনর্গঠনেও উপনিবেশগুলো থেকে আসা মুসলিম শ্রমিকরা বড় ভূমিকা রেখেছিলেন।

ব্রিটিশ ইতিহাসে মুসলিমদের অবদান কেবল যুদ্ধোত্তর অভিবাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংসদে উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে অন্তত ২৫ লক্ষ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৫৫ লক্ষ সৈন্য ও শ্রমিক অবদান রেখেছিলেন। এই দুই সংঘাত মিলিয়ে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। শুধুমাত্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারত থেকে চার লক্ষেরও বেশি মুসলিম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তারা কেবল বহিরাগত নন, বরং ব্রিটিশ স্বাধীনতা রক্ষা ও ইতিহাস গঠনে তাদের রক্ত ও আত্মত্যাগ মিশে আছে।

আজকের অধিকাংশ রাজনৈতিক বয়ান এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেন মুসলিমরা এইমাত্র কোনো নৌকা থেকে নেমে এসেছেন এবং যেকোনো সময় তাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব। কিন্তু চতুর্থ প্রজন্মের একজন লন্ডনবাসীর কাছে ব্রিটেনই একমাত্র ঠিকানা। আধুনিক ব্রিটেন কোনো অপরিবর্তনীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নয়, বরং এটি এমন একটি সমাজ যা খ্রিস্টান, ইহুদি, মুসলিম, হিন্দু, শিখ ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে ক্রমাগত রূপ নিচ্ছে।

পরিশেষে, ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ ব্রিটেন’ মন্তব্যটি কেবল একটি উপহাস নয়, বরং এটি নাগরিকত্বের এক বর্জনমূলক ধারণাকে উসকে দেয়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, কিছু নাগরিক স্বাভাবিকভাবেই জাতির অংশ, আর অন্যরা কেবল স্থায়ী অতিথি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উপস্থিতি বা জাতীয় স্বাস্থ্য সেবায় তাদের অবদান কোনো দখলের প্রমাণ নয়, বরং এটিই সমসাময়িক ব্রিটেনের প্রকৃত চিত্র। বহুত্ববাদ মানে ব্রিটেনের বিলুপ্তি নয়, বরং এটিই আধুনিক ব্রিটেনের পরিচয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কয়েকদিন আগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরাইলের অন্যতম প্রাচীন মিত্র ব্রিটেন সম্পর্কে একটি চাঞ্চল্যকর বর্ণনা দিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর অন্তর্নিহিত প্রস্তাবনাটি বেশ অদ্ভুত: যখন একটি গণতন্ত্রে মুসলমানরা যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র নিজেই কোনোভাবে মুসলিম হয়ে যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাছাই করা আতঙ্ক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, নেতানিয়াহু এবং তার আদর্শগত মিত্ররা তখন ব্রিটেনের মধ্যে কেনো ‘হিন্দুকরণ’ আঁচ করতে পারেননি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সুনাকের স্থলাভিষিক্ত হন কিয়ার স্টারমার, যার স্ত্রী ইহুদি এবং সন্তানরা ইহুদি ঐতিহ্য অনুসারে বেড়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এবারও ‘ব্রিটেনের ইহুদিকরণ’ নিয়ে কোনো কথা হয়নি, কিংবা টেমস নদীর তীরে একটি ইহুদি প্রজাতন্ত্র গড়ে ওঠার কোনো জল্পনাও শোনা যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখন পর্যন্ত, ‘ব্রিটেনের ক্যাথলিকীকরণ’ দৃশ্যত নেতানিয়াহুরও দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে।