জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে হিমালয়ের পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। হিমবাহ গলে বরফ ও তুষারের পরিমাণ কমে যাওয়ায় পাথরধস এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি নেপাল ও পাকিস্তানের কারাকোরাম অঞ্চলে ঘটা ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলো হিমালয়ের এই নাজুক পরিস্থিতির নতুন সংকেত দিচ্ছে।
গত বুধবার নেপালের তিব্বত সীমান্তের কাছে ২৩ হাজার ৭৩৪ ফুট উঁচু লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর পাশে হিমবাহ ও পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে। এই বিপর্যয়ে পানি, কাদা ও পাথরের বিশাল স্রোত প্রায় ৬০ মাইল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত এই ঘটনায় ৫৭৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া আরও অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন।
এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিকে তুষারধসে ১০ জন পর্বতারোহী প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে বিখ্যাত নেপালি পর্বতারোহী নির্মল পুরজাও ছিলেন। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ঘটা এই দুটি বড় দুর্ঘটনা হিমালয় ও কারাকোরাম অঞ্চলের বরফ ও তুষারের দ্রুত পরিবর্তনের বিষয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক আরবিন্দ্র খাড়কার মতে, হিমালয়ের হিমবাহগুলো বছরে গড়ে প্রায় এক মিটার করে বরফ হারাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সমস্যাটি কেবল এভারেস্টেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো হিমালয় অঞ্চলই বরফ সংকটের মুখে। নেপাল ন্যাশনাল মাউন্টেন গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তুল সিং গুরুং জানান, অনেক এলাকায় বরফ সরে গিয়ে খালি পাথর বেরিয়ে পড়ছে, যা চেনা পথগুলোকে দুর্গম করে তুলছে এবং প্রতিটি এলাকায় পাথরধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
হিমালয়ের এই পরিবর্তন নেপালের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশটির মোট অর্থনীতির ৬ দশমিক ১ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। ২০২৩ সালে এই খাতে প্রায় ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ছিল, যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ১৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে প্রায় ১১ লাখ ৬০ হাজার আন্তর্জাতিক পর্যটক নেপাল ভ্রমণ করেছেন, যার মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজার পর্যটকের মূল লক্ষ্য ছিল ট্রেকিং ও পর্বতারোহণ। এই খাতকে কেন্দ্র করে ৩ হাজারের বেশি ট্রেকিং এজেন্সি এবং বিপুলসংখ্যক গাইড, পোর্টার, হোটেল ও পরিবহন সেবা গড়ে উঠেছে।
পর্বতারোহণ থেকে সরকারও বড় অংকের রাজস্ব আয় করে। চলতি বছরের বসন্ত মৌসুমে ৩১টি পর্বতে ওঠার অনুমতি নিয়ে সরকার প্রায় ৯০ লাখ ডলার রয়্যালটি পেয়েছে। শুধু এভারেস্টে বিদেশি পর্বতারোহীদের বসন্তকালীন অনুমতিপত্রের মূল্যই ১৫ হাজার ডলার। তবে অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা জানিয়েছেন, গত দুই দশকে পাহাড়ের চেহারায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ২০০৪ সালে এভারেস্টের খুম্বু আইসফলের অসংখ্য ফাটল পার হতে অ্যালুমিনিয়ামের মই ব্যবহার করতে হতো, কিন্তু বর্তমানে বরফ গলে যাওয়ায় অনেক জায়গায় মইয়ের প্রয়োজনই পড়ছে না।
এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নতুন প্রযুক্তি কিছুটা ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করছে। পর্বতারোহীরা এখন উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস, জিপিএস, তুষারধস শনাক্তকারী যন্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করছেন। ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় সরঞ্জাম পৌঁছানো এবং বিপজ্জনক এলাকা আগে থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় শেরপা ও কর্মীদের ঝুঁকি কমাতে ড্রোনের ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
শরতের ট্রেকিং মৌসুম সামনে রেখে অনেক অভিযান নির্ধারিত রয়েছে। গাইড, পোর্টার ও হোটেল মালিকরা এই মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। তবে মার্কিন পর্বতারোহী ডেভ ওয়াটসনের মতে, এভারেস্টের চূড়ায় বরফ কমে যাওয়ার বিষয়টি পৃথিবীর সামগ্রিক পরিবর্তনের বড় ইঙ্গিত। তিনি মনে করেন, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ যদি এভাবে বরফ হারায়, তবে পৃথিবীর কোনো স্থানই এই পরিবর্তনের বাইরে নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চলতি বছরের বসন্ত মৌসুমে ৩১টি পর্বতে ওঠার জন্য ১ হাজার ১৯৫ জন পর্বতারোহী অনুমতি নিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বরফ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু পর্বতারোহণেই পড়ছে না, বদলে যাচ্ছে পাহাড়ি এলাকার স্বাভাবিক ভূপ্রকৃতিও। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশেষজ্ঞদের মতে, লাংটাংয়ের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে হিমবাহের কোনো অংশ ভেঙে পড়ার পর ঢিলা পাথর ও ধ্বংসাবশেষ বরফ গলা ভেজা মাটির ওপর দিয়ে নিচে নেমে গিয়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করে থাকতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতও ঝুঁকিতে পড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ বিদেশি পর্বতারোহীরা যেখানে কয়েকবার বিপজ্জনক বরফাঞ্চল পার হন, স্থানীয় কর্মীদের তাঁবু, অক্সিজেন, খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে একই পথ বারবার অতিক্রম করতে হয়।



