ভারত-চীন সীমান্ত: আট দফা সমঝোতায় উত্তেজনা হ্রাস

, বিশ্ব

ভারত-চীন সীমান্ত: আট দফা সমঝোতায় উত্তেজনা হ্রাস

দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা কমিয়ে আনতে ভারত ও চীন আট দফা সমঝোতায় উপনীত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের নতুন পথ প্রশস্ত হয়েছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি হ্রাসে একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে। তবে সীমান্ত বিরোধের মৌলিক ও জটিল প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত থাকায় একে সম্পর্কের পূর্ণাঙ্গ পুনর্মিলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

চলতি বছরের আগস্ট মাসে বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর নেতৃত্বে বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ২৫তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকের পরই আট দফার এই সমঝোতা প্রকাশ্যে আসে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা মেনে সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা, ২০০৫ সালের রাজনৈতিক নির্দেশনামূলক নীতির ভিত্তিতে সীমান্ত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সীমানা নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের কার্যক্রম গতিশীল করা। কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যানেলের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের বিষয়েও উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।

প্রস্তাবিত সমঝোতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো পূর্ব ও মধ্য সীমান্ত সেক্টরে দুটি নতুন সামরিক হটলাইন স্থাপন। পাশাপাশি, ঊর্ধ্বতন সামরিক কমান্ডারদের জন্য আরও দুটি বৈঠকস্থল নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব পদক্ষেপ সীমান্তে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা আকস্মিক উত্তেজনা তৈরি হলে তা দ্রুত সামরিক আলোচনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করবে।

আট দফার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও তুলনামূলক নতুন ধারণা হলো ‘আর্লি অ্যান্ড সাবস্ট্যানশিয়াল হার্ভেস্ট’। এই পদ্ধতির সারমর্ম হলো, পুরো সীমান্ত বিরোধ একসঙ্গে না মিটিয়ে যেসব অঞ্চলে মতপার্থক্য কম, সেখানে আগে সমঝোতা করা। এর আওতায় মানচিত্র প্রণয়ন ও সীমা চিহ্নিত করার মতো কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন হবে, আর জটিল বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলো ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য রাখা হবে। পদ্ধতিটির সুবিধা হলো, ছোট ছোট সমঝোতার মাধ্যমে আস্থা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে ঝুঁকি হলো, আংশিক সমাধানের এই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে এটি পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তির বদলে কেবল একটি স্থায়ী সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কাঠামোর রূপ নিতে পারে।

উল্লেখ্য, ১৯৮১ সাল থেকে দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে আসছে। ২০২০ সালের লাদাখ সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। তবে ২০২৪ সালে সীমান্ত টহল সংক্রান্ত সমঝোতা এবং সেনা প্রত্যাহারের পর উত্তেজনা কিছুটা স্তিমিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় হওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন বিদ্যমান। ভারত চীনের ওপর বাণিজ্য নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করলেও বাস্তবে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে উভয় পক্ষই নিজ নিজ উদ্বেগের কথা জানান দিয়ে আসছে। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কের সামান্য উন্নতিতে অর্থনৈতিক সম্পর্কের সব বাধা রাতারাতি দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম।

আট দফা সমঝোতায় আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ও জলবিদ্যুৎ-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি সেপ্টেম্বরেই এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠকের সূচি রয়েছে। তিব্বতে চীনের জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র বা ইয়ারলুং সাংপো নদীকে ঘিরে এই সংশয় প্রবল। দক্ষিণ এশিয়ার পানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় আকস্মিক বন্যা ও নদী প্রবাহের তথ্য আদান-প্রদান তাই জরুরি হয়ে পড়েছে।

গত ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার সুযোগ পান। বৈঠকে উভয় পক্ষই সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে পারস্পরিক সম্মান ও সংবেদনশীলতার ওপর জোর দেয়। তবে এই কূটনৈতিক উষ্ণতা সত্ত্বেও দুই দেশের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখনো প্রকট। অরুণাচল নিয়ে মতভেদ, চীনের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা এবং ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক বেইজিং ও নয়াদিল্লির মধ্যকার আস্থার সংকটকে টিকিয়ে রেখেছে।

পরিশেষে, আট দফা সমঝোতা সীমান্ত বিরোধের চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং এটি বিরোধকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য রাখার একটি কৌশল। নতুন হটলাইন বা বিশেষজ্ঞ বৈঠক সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদি আস্থা নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ের বাস্তব আচরণের ওপর। ২০২৭ সালে ভারতের আয়োজনে পরবর্তী বিশেষ প্রতিনিধি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগ পর্যন্ত সীমান্তে নতুন হটলাইনের কার্যকারিতা এবং ‘আর্লি হার্ভেস্ট’-এর আওতায় নেওয়া পদক্ষেপগুলোর অগ্রগতিই নির্ধারণ করবে ভারত-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আগস্ট ২০২৬-এ বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর নেতৃত্বে দুই দেশের সীমান্তবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের ২৫তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২০ সালের লাদাখ সংঘর্ষের পর সম্পর্কের অবনতি পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তোলে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শান্তিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সামরিক উপস্থিতি ও দৈনন্দিন উত্তেজনা কমানো গেলে সীমান্তে দুর্ঘটনাজনিত সংঘাতের ঝুঁকিও কমতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হিমালয় অঞ্চলের নদীগুলো ভারত, চীন ও বাংলাদেশের মতো একাধিক দেশের পানি, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় এ ধরনের তথ্য বিনিময় শুধু ভারত-চীন সম্পর্কের বিষয় নয়; বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও এর তাৎপর্য রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে কোনো প্রকল্পকে সরাসরি ‘পানি অস্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করার আগে প্রকল্পের প্রকৃত সক্ষমতা, পরিচালন পদ্ধতি, তথ্য বিনিময় এবং ভাটির দেশগুলোর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্যদিকে ভারতও চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক উত্থানকে নিজের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভারত-চীন সম্পর্কের বর্তমান পর্যায়কে তাই ‘সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে গেছে’ বলার চেয়ে ‘সংঘাত নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর্যায়’ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।