দুই বছরের শিশুসন্তান আতিফ আবদুল্লাহকে চোখের আড়াল করতে চাননি বলেই ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পরও হাসপাতালের বিছানায় যেতে রাজি হননি জান্নাতুল মাওয়া সুমায়া। মাত্র একুশ বছর বয়সী এই তরুণী মায়ের এমন মাতৃত্বের অমোঘ টান শেষ পর্যন্ত তার জীবনের বিনিময়েই শেষ হয়েছে। বর্তমানে সন্দ্বীপ উপজেলার মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এই তরুণীর অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার স্বামী আবু তালেব নিশাদ স্থানীয় একটি মাদরাসার শিক্ষক এবং তাদের আদি বাড়ি একই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে। তার বাবার বাড়ি একই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে। ভেজা পথের একপাশে সুদৃশ্য কাপড়ে ঢাকা খাটিয়া; ভেতরে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন মাত্র একুশ বছর বয়সী তরুণী মা জান্নাতুল মাওয়া সুমাইয়া। জানাজার জন্য সারিবদ্ধ হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। আর খাটিয়ার ঠিক সামনেই কালো ছাতার নিচে বাবা আবু তালেব নিশাদের কোলে চড়ে বিস্ময়ভরা চোখে সবার দিকে তাকিয়ে আছে দুই বছরের ছোট্ট শিশু আতিফ আবদুল্লাহ।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, সুমায়া গত পাঁচ দিন ধরে প্রচণ্ড জ্বরে ভুগছিলেন। সোমবার ডেঙ্গু পরীক্ষা করালে তার শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি ধরা পড়ে। সেই সময় চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ছোট সন্তানকে রেখে দূরে থাকার মানসিক কষ্টে তিনি বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে হঠাৎ তার শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে, যার ফলে তাকে দ্রুত সন্দ্বীপ মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকের স্পষ্ট পরামর্শ সত্ত্বেও কেবল বুকের ধনকে কাছে রাখতে নিজ বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।
তবে সন্দ্বীপ মেডিকেল সেন্টারের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রোগীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল। দ্বীপে কোনো নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ সুবিধা না থাকায় তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম শহরে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাত আড়াইটার দিকে ঝুঁকি নিয়ে স্পিডবোটযোগে তাকে চট্টগ্রামে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম নগরের পার্কভিউ হাসপাতালে পৌঁছালে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সন্দ্বীপে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমাগত উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর তথ্যমতে, গত ১৫ দিনে দ্বীপটিতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মানস বিশ্বাস জানিয়েছেন, সন্দ্বীপে বর্তমানে শিশু ও মধ্যবয়স্কদের মধ্যে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। গত সাত দিনে জ্বরের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তিনি জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করার এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের শুরু থেকেই হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় দুটি বেসরকারি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ দিনে সন্দ্বীপে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে।
সন্তানকে কাছে পাওয়ার আকুতি যে মায়ের জীবন কেড়ে নিয়েছে, সেই মর্মান্তিক দৃশ্য এখন সন্দ্বীপের মানুষের মুখে মুখে। এখন কেবল অবুঝ শিশু আতিফ বাবার কোলে চড়ে অবাক দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকিয়ে থাকছে, বুঝতে পারছে না তার পরম মমতাময়ী মা আর কোনোদিন তার ডাকে সাড়া দেবেন না। অবুঝ শিশুটি এখনো জানেই না, সামনের ওই খাটিয়ার ভেতরেই চিরনিদ্রায় শায়িত তার পরম আদরের গর্ভধারিণী মা।



