ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের তীব্র হামলার মুখে সৌদি আরবের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় ৪১ বছর বয়সী সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাকে বর্তমানে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এবং বাংকার সুবিধাসম্পন্ন কয়েকটি প্রাসাদের মধ্যে স্থানান্তর করা হচ্ছে। মঙ্গলবার জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পর থেকে যুবরাজকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তার সুরক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে একটি বাছাই করা বিশেষ নিরাপত্তা দল। এমন অবস্থায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে বাঁচিয়ে রাখতে সুরক্ষিত এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে নেয়া হচ্ছে।
গত শনিবার সৌদি আরবের রাজধানীতে অবস্থিত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। বিগত এক দশকের মধ্যে এটিই দেশটির জন্য সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকের শারীরিক অবস্থা গুরুতর। এছাড়া, গত পাঁচ দিনে বিমানবন্দরটিতে চারবার হামলা চালানো হয়েছে, যে কারণে এটি এখনো বন্ধ রয়েছে। হামলার ঘটনায় একজন ২৮ বছর বয়সী মিসরীয় নারী ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট গুরুতর জখম হন; বিস্ফোরণে তার একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তিনি মারা যান। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে পরে তার মৃত্যু হয়। হামলায় অঙ্গহানির শিকার হওয়া একাধিক ব্যক্তির মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।
ইরান ও এর সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জড়িত সংঘাতের ইতিহাসে এটিকে এককভাবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, এই হামলার জবাব সমানভাবে দেওয়া হবে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। রিয়াদের মিত্র দেশগুলোও তাদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে। হামলার বিষয়ে অবহিত কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংঘাতগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর চালানো হামলাগুলোর মধ্যে এটিই ছিল এককভাবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে বিরোধ চলছে। ২০২২ সালে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও চলতি বছরের জুলাইয়ে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তা ভেঙে যায়। হুতিদের অভিযোগ, সানা বিমানবন্দরে ইরানি একটি বিমানের অবতরণে বাধা দিয়েছে সৌদি বাহিনী, যার প্রতিক্রিয়ায় তারা নতুন করে হামলা শুরু করে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। ইরান থেকে আসা একটি বিমান ইয়েমেনের রাজধানী সানা’র বিমানবন্দরে অবতরণের চেষ্টা করার সময় সৌদি বাহিনী সেখানে গুলি চালিয়েছে।
আঞ্চলিক অস্থিরতা নিয়ে ইরানও তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, এই সংঘাত শুধুমাত্র ইসরাইলিদের লাভবান করছে। এছাড়া ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তিনি সামরিক সংঘাতের বদলে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন এবং সংঘাত নিরসনে তেহরান মধ্যস্থতা করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন। তবে চলমান পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরব ও হুতিদের দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন করে জটিল আকার ধারণ করেছে।



