যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি খাতের অস্থিরতা যে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি। দোহায় গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে যোগ দিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমরা এখনো সংকটের চূড়ান্ত বিন্দুতে পৌঁছাইনি। আগামী দিন ও মাসগুলোতে অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের চাপের আশঙ্কা রয়েছে। সোমবার দোহায় গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় কাতারের প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা আল থানি বলেন, জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা এখনও সংকটের চূড়ায় পৌঁছাইনি। কাতার ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সামনে থাকা বিভিন্ন নিরাপত্তাঝুঁকি তুলে ধরে আল থানি বলেন, এর মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কাও রয়েছে। এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকা-েও প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরাইলসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় কাতার, পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতা সফল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্যদেশগুলো, পাকিস্তান ও তুরস্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মিত্রদেরও যুক্ত করতে হবে। কাতারের কাছ থেকে যেভাবে বিমান উপহার পেয়েছিলেন ট্রাম্প। তার ভাষায়, মধ্যস্থতা করার অর্থ এই নয় যে আমাদের পক্ষ থেকে যেকোনো প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত নয়- এমনটা ভাবতে হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে তীব্র অস্থিরতা বিরাজ করছে।
তেল ও এলএনজি পরিবহনের এই প্রধান পথটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিশ্ব অর্থনীতির চাকা ধীর হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশ্বে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি।
মার্চ মাসে কাতারের রাস লাফান শিল্প কমপ্লেক্সে ইরানের হামলার ঘটনা উল্লেখ করে আল থানি বলেন, ওই হামলা আমাদের বিস্মিত করেছিল। তাদের সঙ্গে বসবাসের উপায় আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।
এ ঘটনায় স্থাপনাগুলোর যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামত করতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে এই হামলা থেকে শিক্ষা নিয়ে কাতার এখন জাতীয় নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষায় নতুন করে কৌশল সাজাচ্ছে। এ হামলা থেকে কাতার শিক্ষা নিয়েছে উল্লেখ করে আল থানি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো অপ্রত্যাশিত হামলা থেকে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ইরানের সঙ্গে কাতারের সম্পর্ক অনেকটা আস্থাভিত্তিক ছিল এবং সমুদ্রতলীয় গ্যাসক্ষেত্রের অভিন্ন স্বার্থ তাদের দীর্ঘদিনের অংশীদার। হামলার পরও তেহরানের সঙ্গে দোহা আলোচনা অব্যাহত রেখেছে বলে জানান তিনি। আল থানি জোর দিয়ে বলেন, আমরা কখনোই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করি না। মধ্যস্থতা করার মানে এই নয় যে, আমরা নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়ে উদাসীন থাকব। বরং মধ্যস্থতা ও সামরিক প্রস্তুতি—দুটোই সমানভাবে চলছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর টোল বা ট্রানজিট ফি আরোপের ঘোর বিরোধিতা করেন কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে শেষ পর্যন্ত বিশ্বের সাধারণ ভোক্তা ও ক্রেতা সাধারণকেই উচ্চমূল্যের দায়ভার বহন করতে হবে। সংকট নিরসনে কাতার, ওমান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতার পাশাপাশি জিসিসি সদস্য দেশ, তুরস্ক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের নিয়ে একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক সংলাপ প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।
দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে ফ্রান্স ও জার্মানি যেভাবে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, ইরানের সঙ্গেও ঠিক সেভাবে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক তৈরির পথ খোঁজার তাগিদ দেন আল থানি। তবে একই সঙ্গে কাতার এখন আকাশ প্রতিরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ড্রোনবিরোধী ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। গত তিন-চার দশকের প্রতিরক্ষা অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কাতার তাদের ৯ শতাংশের বেশি হুমকি প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার দাবি, গত তিন থেকে চার দশকে দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা সামরিক সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির ফলে ৯০ শতাংশের বেশি হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া নতুন একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন আল থানি।
কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ বিমান ঘাঁটির সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ চলমান রয়েছে। এ ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্যান্য মিত্র দেশের সেনাসদস্যরাও অবস্থান করেন। মার্চের শুরুর দিকে হামলার সময় কাতার ইরানের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিল বলেও সূত্র জানিয়েছে। উপ-প্রধানমন্ত্রী জানান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা শীঘ্রই একটি নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। কোন দেশ এই জোটে থাকবে তা স্পষ্ট না করলেও, সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও অঞ্চলজুড়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য। আল থানি বলেন, আজ আমি আনন্দের সঙ্গে আরও ঘোষণা করছি, শিগগিরই আমরা একটি নতুন অংশীদারিত্বের ঘোষণা দেব।



