নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সন্দ্বীপে ইলিশ শিকার, সহায়তা মেলেনি জেলেদের

, বাংলাদেশ

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সন্দ্বীপে ইলিশ শিকার, সহায়তা মেলেনি জেলেদের

মা ইলিশ রক্ষায় সরকারিভাবে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। এই সময়ে ইলিশ ধরা আইনত নিষিদ্ধ থাকলেও চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বিভিন্ন ঘাটে চিত্রটি ভিন্ন। উপজেলার উত্তর অংশের বটগাছতলা ও রহমতপুর ঘাট এলাকায় নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে ইলিশ শিকার ও কেনাবেচার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের আঁধারেই এসব মাছ হাতবদল হচ্ছে। উপজেলার উত্তর সন্দ্বীপের বটগাছতলা ইলিশের ঘাটে প্রতিদিন সাত থেকে আটটি নৌকা সাগরে গিয়ে ইলিশ ধরে ফিরছে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে তাঁরা সাগরে ফিরবেন বলে প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। মাহমুদুন নবী বলেন, ১৪ অক্টোবর রাতে উত্তর সন্দ্বীপের বটগাছতলা ইলিশের ঘাটে অভিযান চালিয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের ধরার চেষ্টা করেন তাঁরা। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা এই প্রতিবেদককে জানান, জোয়ারের ওপর নির্ভর করে রাত ১০টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে ইলিশ নিয়ে ঘাটে ফেরেন জেলেরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জেলে বলেন, সূক্ষ্ম ফাঁসের কারেন্ট জালে ছোট আকারের ইলিশ, এমনকি জাটকাও ধরা পড়ছে। পরে জানতে পারেন, আশপাশের অন্য স্থানে ইলিশ কেনাবেচা হয়েছে। অন্য সময়ের তুলনায় এসব মাছের দামও কম। ধরা পড়া কিছু ইলিশের দৈর্ঘ্য ছয় থেকে আট ইঞ্চি। সাধারণ সময়ে উন্মুক্ত ‘ডাক’ পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে ইলিশ বিক্রি করা হয়।

নিষেধাজ্ঞার কারণে আয়-রোজগার বন্ধ হওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন জেলেরা। নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর ১৫ দিন অতিবাহিত হলেও মৎস্য বিভাগ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলেদের সহায়তার চাল এখনো পৌঁছায়নি। অভাবের তাড়নায় অনেক জেলে পেটের দায়ে আইন অমান্য করে সমুদ্রে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার কারণে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন জেলেরা।

উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা সফল করতে ৮ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন ঘাটে ২৩টি যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তবে অধিকাংশ অভিযানেই কোনো ইলিশ বা জেলেকে আটক করা সম্ভব হয়নি। কেবল দুটি অভিযানে ৩০৫ কেজি ইলিশ ও ৪২ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে এবং দুই জেলেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। তবে ২১টিতেই কাউকে আটক কিংবা ইলিশ উদ্ধার করা যায়নি। পরদিন ৩০ অক্টোবর আবার সাগরে যাবেন।

সন্দ্বীপের মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মোতাছিম বিল্লাহ জানান, অভিযান আরও জোরদার করতে তারা কোস্টগার্ডের সহায়তা নেওয়ার কথা ভাবছেন। পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক নজরদারি বাড়ানো ও জনবল বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এর মধ্যেই রহমতপুর ও বটগাছতলায় চালানো বিভিন্ন অভিযানে অবৈধ জাল জব্দ ও জরিমানার ঘটনা ঘটেছে। সন্দ্বীপ মৎস্য অফিসের মাঠ সহকারী মাহমুদুন নবী জানান, বুধবার রহমতপুর ঘাট থেকে অবৈধ জাল জব্দ করে পুড়িয়ে দিয়েছে মৎস্য বিভাগ।

অন্যদিকে, দ্বীপের দক্ষিণ অংশের চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। সারিকাইত ইউনিয়নের বাংলাবাজার, গাছতলী ও মাইটভাঙ্গা এলাকায় জেলেরা জাল মেরামত এবং নৌকার সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা জেলেরা জানিয়েছেন, তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আপাতত সাগরে যাওয়া থেকে বিরত আছেন। সেখানে জেলেরা জাল বোনা, ছেঁড়া অংশ মেরামত ও মোটা রশি জোড়া দেওয়ার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জাল মেরামত করতে করতেই জেলে আবুল বাশার (৪৫) বলেন, ‘এখন সাগরে যাওয়া বন্ধ, তাই হাতে সময় আছে বলে জাল তুনে (মেরামত) রেডি হইতেছি। উপজেলার সদারহাটের একটি ফাঁকা জায়গায় মোটা সুতার জাল বুনছিলেন দুর্লভ জলদাস (৩৫)। পশ্চিম মাইটভাঙ্গা বেড়িবাঁধ ধরে গাছতলীর দিকে যেতে আরও কয়েকটি জায়গায় একই দৃশ্য দেখা যায়। বেশির ভাগ নৌকার মাঝি ও জেলেরা ছুটিতে গেছেন। রাতভর ঘাটের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে ভোরের অপেক্ষায় ছিলেন।

সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞাকালে কার্ডধারী জেলেদের সহায়তায় ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা। তবে সন্দ্বীপের মোট ৮ হাজার ৩৩২ জন কার্ডধারী জেলের মধ্যে মাত্র চার হাজার জনকে এই সহায়তার আওতায় আনার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ১৫ দিন পার হলেও শুক্রবার পর্যন্ত কেউ এই চাল হাতে পাননি।

সহায়তা না পাওয়া জেলেদের একজন সন্তোষপুর ইউনিয়নের অর্জুন জলদাস। তিনি জানান, মাছ ধরাই তার একমাত্র পেশা, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার এই দুর্দিনেও তিনি মৎস্য কার্ড পাননি। স্থানীয় অনেক জেলের অভিযোগ, সরকারি সহায়তা সময়মতো না পৌঁছানোয় তাদের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। এ কারণে বাড়তি টাকার আশায় অনেকেই সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ জেলেদের। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নির্ধারিত কিছু ব্যবসায়ী গোপনে মাছ কিনে নিচ্ছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমজাদ হোসেন জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে সব এলাকায় জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দুর্গাপূজার ছুটির কারণে বিতরণ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়েছে এবং আগামী রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই খাদ্যসহায়তা দেওয়া শুরু হবে।

মৎস্য কর্মকর্তা মো. মোতাছিম বিল্লাহ আরও জানিয়েছেন, কার্ডের তালিকা হালনাগাদের প্রক্রিয়া চলছে। যারা এখনো কার্ড পাননি, তাদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে তিনি জানান, পরবর্তী সময়ে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কোনো জেলে জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগ করলে তাকে দ্রুত সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।