দুর্গাপূজায় সফল তারেক রহমান: সামনে রয়েছে তিন চ্যালেঞ্জ

, বাংলাদেশ

দুর্গাপূজায় সফল তারেক রহমান: সামনে রয়েছে তিন চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে দুর্গাপূজার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন ও নির্বিঘ্ন উদ্যাপনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর এটি ছিল তার অধীনে প্রথম দুর্গাপূজা। উৎসবের আয়োজন ও নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরেও অনেকের ইতিবাচক মন্তব্য উঠে এসেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সাফল্য ধরে রাখা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

বাঙালি হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। এ বছর উৎসবটি ঘিরে নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। দেশজুড়ে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপ স্থাপন করা হয়েছিল, যার মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ছিল ২৫৮টি। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় দেড় হাজার মণ্ডপ বৃদ্ধি পেয়েছে। উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে ছিল আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ২ লাখ ১২ হাজার ১১৮ জন সদস্য। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত থেকে পশ্চিমবঙ্গ, এমনকি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশেও দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের অন্যতম প্রধান উৎসব। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগ নিয়ে তিনি নিয়মিত সরব ছিলেন।

নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও নিশ্ছিদ্র করতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি মণ্ডপে আটজন এবং অন্য মণ্ডপগুলোতে ছয়জন করে আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। লেখক: দীপ হালদার একজন লেখক এবং দ্যপ্রিন্ট-এর সহযোগী সম্পাদক।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রস্তুত ছিল ১০৪টি স্ট্রাইকিং টিম। একই সঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তবর্তী আট কিলোমিটার এলাকার প্রায় ১ হাজার ৮০০টি মণ্ডপের নিরাপত্তায় ১৮টি বেইস ক্যাম্প স্থাপন ও নিয়মিত টহল পরিচালনা করে। সরকার পূজা উপলক্ষে টানা তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করেছিল, যা সরকারি ক্যালেন্ডারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলে পাঁচ দিনের ছুটিতে রূপ নেয়। মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিনের এই আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোটি মানুষের আবেগ ও ধর্মীয় বিশ্বাস। সরকার দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করে। এর পর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর শুক্র ও শনিবারের নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় কার্যত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পান সরকারি চাকরিজীবীরা।

এই আয়োজনের ব্যাপক প্রশংসায় মুখর হয়েছেন লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অধিকারকর্মীরা। চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীসহ অনেকের মতে, আগের বছরগুলোর তুলনায় এবারের উৎসবের পরিবেশ ছিল অনেক বেশি ভীতিমুক্ত। কলকাতার সাংবাদিক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপের জাঁকজমকপূর্ণ সাজসজ্জার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এছাড়া ইনফ্লুয়েন্সার ড্যানিয়েল আফজালুর রহমান ও সাদিকুর রহমান খানের মতো ব্যক্তিত্বরাও বাংলাদেশের পূজার পরিবেশের প্রশংসা করেছেন। কলকাতার সাংবাদিক, ইনফ্লুয়েন্সার ও টেলিভিশন উপস্থাপক ময়ূখ রঞ্জন ঘোষের প্রশংসাও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতার পূজামণ্ডপগুলোকে যারা পুরস্কার দেয়, তাদের চট্টগ্রামের মণ্ডপগুলোর জন্য আলাদা পুরস্কারের ব্যবস্থা করা উচিত।

উৎসবের জাঁকজমক সত্ত্বেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। তবে উৎসবের জাঁকজমক দিয়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার কিংবা ধর্মীয় স্বাধীনতা-সংক্রান্ত সব সমস্যার সমাধান হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

পূজা শুরুর আগে সারা দেশে প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে হামলার অন্তত ৩৪টি ঘটনার তথ্য দিয়েছিল বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি।

হিন্দু অধিকারকর্মী জয়ন্ত কর্মকারের ভাষ্যমতে, অনেক গ্রামপর্যায়ে ইসলামপন্থী ধর্মীয় বক্তারা পূজার বিরোধিতা করেছেন এবং একে ‘হারাম’ আখ্যা দিয়ে মুসলমানদের উৎসবে অংশ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

জয়ন্ত কর্মকার আরও দাবি করেন, সরকার পরিবর্তনের পরও হিন্দুদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়ে গেছে।

তারেক রহমানের সামনে এখন তিনটি প্রধান পরীক্ষা দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা। মন্দির কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রায় আট একর জমির মধ্যে ৫ দশমিক ৬ একর জমি অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এই জমি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা হিন্দু ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। এদিকে জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে উঠে আসা ছাত্রনেতাদের গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দুর্গাপূজার সময় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দেয়া বক্তব্যের কারণে আলোচনায় এসেছেন। মন্দির কমিটির সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে অবৈধভাবে দখল হওয়া মন্দিরের জমি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবেন।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন হিন্দু ভোটারদের মনে দোলাচল সৃষ্টি করতে পারে। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে হিন্দু ভোটারদের একটি বড় অংশ বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছিল, যার অন্যতম কারণ ছিল জামায়াতে ইসলামীকে ক্ষমতার বাইরে রাখা। তবে শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরেন, তবে এই ভোটাররা পুনরায় আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তৃতীয়ত, মৌলবাদী ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর চাপ সামলানো। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতার সুবাদে এবারের পূজা মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হলেও, দীর্ঘমেয়াদে সংখ্যালঘুদের আস্থা ধরে রাখা এবং হামলাকারীদের বিচার করা তারেক রহমানের সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে। উৎসবের সাফল্য তখনই স্থায়ী হবে, যখন এই নিরাপত্তা ও সহনশীলতার পরিবেশ সারা বছর বজায় থাকবে।