পাকিস্তানের বর্তমান রাজনীতিতে এক গভীর বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যাপক জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবি নিয়ে রাজপথে নামা দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) বারবার রাষ্ট্রের কৌশলের কাছে হোঁচট খাচ্ছে। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি ৭৪ বছর বয়সী এই নেতা। তার মুক্তির দাবিতে দলটি নিয়মিত আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় কঠোর অবস্থান ও কৌশলগত বাধার কারণে তা কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারছে না। প্রশ্ন হলো, ইমরানের প্রতি জনসমর্থন কেন রাষ্ট্রের উপর কার্যকর চাপ তৈরি করতে পারছে না। ২০২৩ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর থেকে কারাবন্দি ইমরান খান। রাজপথে আন্দোলন বারবার থেমে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো প্রশাসনের সর্বাত্মক অবরোধ ও চরম বলপ্রয়োগ। এই রায় কার্যকর হলে ক্ষমতাসীন জোটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথ বন্ধ হয়ে যেত।
সর্বশেষ ঘটনার প্রেক্ষাপটে, চলতি বছরের ৪ অক্টোবরে খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদির নেতৃত্বে ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ শুরু করেছিলেন পিটিআই সমর্থকরা। কিন্তু রাজধানীতে পৌঁছানোর আগেই তাদের যাত্রা বাধাগ্রস্ত করা হয়। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর, ১১ অক্টোবর কেন্দ্রীয় সরকার খাইবার পাখতুনখোয়ার প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করে এবং গভর্নরের শাসন চাপিয়ে দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জঙ্গিবাদ দমনে ব্যর্থতার কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে; বিপরীতে পিটিআই একে ইমরান খানের মুক্তি আন্দোলন নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র বলে অভিযোগ করেছে।
পিটিআইয়ের আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রযন্ত্র ‘হার্ড স্টেট’ বা কঠোর রাষ্ট্রীয় নীতি অনুসরণ করছে। যখনই কোনো লংমার্চ বা কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়, তখন ভারী শিপিং কনটেইনার ব্যবহার করে সড়কগুলো অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের মাধ্যমে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কসেবা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে। এতে মাঠপর্যায়ের আন্দোলনকারীরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে ব্যর্থ হয়। আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্টের (এসিএলইডি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসের তুলনায় ২০২৬ সালে আন্দোলন দমনে পুলিশি বাধা দ্বিগুণ বেড়েছে, অথচ পিটিআইয়ের কর্মসূচি কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। শহরগুলোকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত করে যাতায়াত ব্যবস্থা অনেকটাই স্তব্ধ করে দেয়া হয়। আন্দোলন চলাকালে দেশজুড়ে দ্রুতগতির ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মোবাইল নেটওয়ার্কসেবায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের মধ্যেই টিয়ারগ্যাস, রাবার বুলেট এবং গণগ্রেপ্তার অভিযান শুরু করে পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত মোট কর্মসূচির সংখ্যা কমে গেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। পেকা আইনের ২০২৫ সালের সংশোধনীতে নির্দিষ্ট ধরনের মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান করা হয়। একইভাবে, অনলাইন মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহার করা হচ্ছে আইনি ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা। এতে নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি ও স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ সীমিত হতে পারে।
সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে রাষ্ট্রের সামরিক কাঠামো বর্তমানে অনেক বেশি শক্তিশালী। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পাস হওয়া ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ‘চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস’ পদ তৈরি করে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর একক নিয়ন্ত্রণ সেনাপ্রধানের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। এছাড়া তার চাকরির মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে, ফলে ২০৩০ সাল পর্যন্ত তার অবস্থান সুনিশ্চিত। ভারতের সঙ্গে সংঘাতের পর তাকে ফিল্ড মার্শাল পদ ও আজীবন ফৌজদারি দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমকেও আইনি ও প্রযুক্তিগতভাবে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে, যা সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পাওয়া কঠিন করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তথ্যপ্রযুক্তির ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। আইনে মিথ্যা তথ্যের সংজ্ঞা অস্পষ্ট হওয়ায় সরকারের সমালোচক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এর অপব্যবহারের আশঙ্কা জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
নির্বাচনী লড়াইয়েও পিটিআই চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি। ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাদের প্রতীক কেড়ে নেওয়ায় স্বতন্ত্রভাবে লড়তে হয়েছে। ৯৩টি আসনে জয় পেলেও, পরবর্তী আইনি গোলকধাঁধায় পড়ে সংরক্ষিত আসন থেকে বঞ্চিত হয়েছে দলটি। এমনকি আদালতের চূড়ান্ত রায়েও পিটিআইয়ের অর্জিত রাজনৈতিক সাফল্য নস্যাৎ করে দেওয়া হয়। ইমরান খানের বিরুদ্ধে সাইফার, ইদ্দত, আল-কাদির ট্রাস্ট ও তোষাখানাসহ একাধিক মামলায় দীর্ঘ মেয়াদী কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যার অনেকগুলোই বর্তমানে আপিল প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৬তম সংশোধনীতে বিচারপতি নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন এবং সাংবিধানিক মামলা শুনতে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের বিধান করা হয়। ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে দলটিকে ঐতিহ্যবাহী ‘ক্রিকেট ব্যাট’ প্রতীক ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি। ফলে পিটিআই-সমর্থিত প্রার্থীরা স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ৯৩টি আসনে জয়লাভ করেন তারা। ২০২৪ সালের ১২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ পিটিআইকে সংরক্ষিত আসন পাওয়ার যোগ্য ঘোষণা করে ঐতিহাসিক রায় দেন। রায় বাস্তবায়ন নিয়ে চলতে থাকে আইনি বিরোধ। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ২৭ জুন সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ আগের রায় বাতিল করে পিটিআইকে সংরক্ষিত আসনের অযোগ্য ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, পিটিআইয়ের অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীদের প্রাথমিক ভোটের হিসাব বদলে চূড়ান্ত ফলে অন্যদের বিজয়ী দেখানো হয়েছে।
কারাগারে ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ বেড়েছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, টানা আট মাসের বেশি সময় ধরে তিনি পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, কারাগারে থাকা অবস্থায় তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় ৮৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পিটিআইয়ের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা, নেতৃত্বের অভাব এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে বর্তমান সরকারের সুবিধাজনক অবস্থান ইমরান খানের মুক্তি আন্দোলনকে আরও জটিল করে তুলেছে। পিটিআইয়ের জন্য এখন শুধু রাজপথের কর্মসূচিই যথেষ্ট নয়, বরং দলের নেতৃত্বে সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক কৌশলের সমন্বয় প্রয়োজন।



