ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়োজিত রাজস্ব সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। দেশের জনগণ বিশেষ করে করদাতারা এনবিআরকে তাদের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। দক্ষ ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই জন আস্থা অর্জন সম্ভব। করদাতাদের সেই প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব আপনাদেরকেই নিতে হবে। বর্তমান সরকার এনবিআর তথা রাজস্ব কাঠামোকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধ পরিকর।
তিনি বলেন, বিতাড়িত পতিত পলাতক ফ্যাসিস্ট চক্র দেশকে চূড়ান্তভাবে একটি ঋণনির্ভর ও আমদানি-নির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়েছে। বর্তমান সরকার শুধুমাত্র বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অতিরিক্ত ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার নীতি বিরোধী। সুতরাং, রাজস্ব আহরণে আমাদেরকে অবশ্যই অভ্যন্তরীণ আয়ের ক্ষেত্র এবং উৎস বাড়াতে হবে। সরকারপ্রধান বলেন, আজকের এই রাজস্ব সম্মেলনকে আমি সাধারণ কোনো সম্মেলন হিসেবে দেখি না। কারণ, এনবিআরের কার্যক্রমের সাফল্যের ওপরই সরকারের সকল উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের সফলতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। আমি আশা করি, আজকের এই সম্মেলন আগামী দিনে আপনাদের আরও অধিক সাফল্যের পথ নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা কী ধরনের ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছি, তা দেশের যে কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষের চেয়ে আপনারা বেশি অবগত। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণের অভিশাপ থেকে রাষ্ট্রের অন্য সব প্রতিষ্ঠানের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও মুক্ত থাকতে পারেনি। এনবিআরের নীতি-নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থে কাউকে পৃষ্ঠপোষকতা, কারো প্রতি বিরূপ মনোভাব কিংবা রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতা এনবিআরকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল। এর ফলে এনবিআরের ওপর মানুষের আস্থা বিনষ্ট হয়েছিল। এখন সময় এসেছে সেই হারানো আস্থা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে সাজানোর।
আয়ের ক্ষেত্র এবং উৎস বাড়াতে সরকার গণমুখী উৎপাদন নীতি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর ফলে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়ন সম্প্রসারিত হবে। মানুষের আয় বাড়বে, ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে এবং জনগণ আরও উন্নত সরকারি সেবা পাবে। এক্ষেত্রেও এনবিআরের দক্ষ ও কার্যকর ভূমিকা অনস্বীকার্য। একজন আধুনিক রাজস্ব কর্মকর্তাকে অর্থনীতি, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখতে হবে। তা না থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামগ্রিক কর্মক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। একটি ভালো রাজস্ব ব্যবস্থা এমন হওয়া দরকার, যেখানে মানুষ কর দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন। কর প্রদান পদ্ধতি যথাসম্ভব দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত এবং সহজ করা প্রয়োজন।
তারেক রহমান বলেন, অনলাইনে কর পরিশোধ করা সম্ভব হলে করদাতার অফিসে আসার প্রয়োজন নেই। যথানিয়মে কর আদায় করলে তা করদাতার জন্য যেমন লাভজনক, একইসঙ্গে রাষ্ট্র ও সরকারের জন্যও ইতিবাচক। আপনাদের আচরণ ও কার্যক্রমের মাধ্যমে করদাতার মনে এই বিশ্বাস জন্ম নিলে কর আদায় অনেক সহজ হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, কর ব্যবস্থাপনা কিংবা কর আদায় পদ্ধতি সহজ এবং দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত হওয়া প্রয়োজন। আমার কাছে মনে হয়, একই করদাতাদের ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির নীতি টেকসই পদ্ধতি নয়। বরং কর প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদেরকে যথাযথ নিয়মে করের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা জরুরি। এ জন্য ডিজিটালি আধুনিক ডাটা-ভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ভ্যাট আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজস্ব উৎস। তবে ভ্যাট ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। ভ্যাট প্রশাসনের জটিলতার কারণে যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও আপনাদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে। কাস্টমস, ভ্যাট কিংবা ট্যাক্স আদায় শুধু এনফোর্সমেন্টের বিষয় নয়, বরং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স দাতাদের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হলে রাজস্ব আহরণ অনেক সহজ হয়ে যায়। সুতরাং, দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষ এই প্রতিষ্ঠানকে ভয় না করে বরং বিশ্বাস করে।



