April 24, 2026, 2:50 pm
Title :
সংসদের কেনাকাটায় ‘হরিলুট’, ৫ এমপিকে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন বাড়ছে যানবাহনের ভাড়া ও দ্রব্যমূল্য: ডা. জাহেদ সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্ত ফেসবুক অফিস কেন জরুরি: সিরাজুল হক সাজিদ অচলাবস্থায় রাজশাহী নার্সিং কলেজ, শিক্ষার্থীদের ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তির প্রতিবাদে রাজশাহীতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ গাইবান্ধায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন সংরক্ষিত নারী আসনে ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করেছে জামায়াত কেশবপুর কলেজে অবহেলা, ৩৯ শিক্ষার্থী ঝুঁকিতে গণপূর্ত বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে উন্নয়ন কাজে অনিয়মের অভিযোগ

জায়নামাজ থেকে রণাঙ্গন: একাত্তরে যাঁরা পীর হয়েও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা

  • Update Time : Tuesday, December 16, 2025
  • 137 Time View
স্টেনগান টু জায়নামাজ: একাত্তরে যুদ্ধ করেছিলেন সুফি সাধক, পীর-মাশায়েখ ও দরবেশেরা

‘আজান হয়েছে, অন্তত দুই রাকাত ফজরের নামাজ পড়তে দিন।’
রমজান মাসের সেই ভোরে পাকিস্তানি সেনাদের কাছে জীবনের শেষ মিনতিটুকু করেছিলেন পীর বেলায়েত হোসেন। কিন্তু নিজেদের ‘মুসলিম আর্মি’ দাবি করা সেই হানাদাররা তাঁকে নামাজ পড়ার সুযোগ দেয়নি। মুহূর্তেই ব্রাশফায়ারে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয় তাঁর শরীর। সেদিন শুধু তিনি নন—তাঁর পরিবারের আরও ১০ জন সদস্যকেও একসঙ্গে হত্যা করা হয়।

পরীর বাড়ির কিশোর সন্তান মুকুল মায়ের সম্ভ্রম রক্ষায় বন্দুক তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু তাকেও ছাড় দেওয়া হয়নি। পুকুরপাড়ের সেই রক্তমাখা ভোর আজও ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দেয়—একাত্তরে ইসলাম বিপন্ন ছিল না, বিপন্ন ছিল মানবতা। আর সেই মানবতা রক্ষায় শহীদ হয়েছিলেন এক পীর পরিবার।

দীর্ঘদিন ধরে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান চালু রাখা হয়েছে—এই যুদ্ধ নাকি ছিল ‘ইসলাম বনাম বাংলাদেশ’ কিংবা ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’র সংঘর্ষ।

এই বিভ্রমটি তৈরি করেছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের এদেশীয় দোসররা। স্বাধীনতার পরও একটি গোষ্ঠী সচেতনভাবে প্রচার করেছে—দাড়ি, টুপি আর তসবিহধারী মানুষ মানেই রাজাকার।

কিন্তু ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে উঠে আসে এক ভয়াবহ অথচ গর্বের সত্য। বাংলার সুফি সাধক, পীর-মাশায়েখ ও খানকারের নিভৃতচারী দরবেশরা শুধু জায়নামাজে বসে দোয়া করেননি—প্রয়োজনে বুক পেতে দিয়েছেন বুলেটের সামনে, কেউ কেউ আবার স্টেনগান হাতে প্লাটুন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই সত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত শাহ সুফি হযরত মাওলানা সোলাইমান শাহ চিশতী (রহ.)।
একাত্তরের এপ্রিল মাস। কুষ্টিয়ার পদ্মার তীর তখন বারুদের গন্ধে ভারী। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পেরিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী যখন ভেড়ামারা তছনছ করছে, তখন গোলাপনগরের এক নিভৃত আস্তানায় অবস্থান করছিলেন তিনি।

চাইলেই পালাতে পারতেন। কিন্তু জানতেন—তিনি পালালে ভেঙে পড়বে হাজারো ভক্তের মনোবল। পলায়ন সুফিবাদের শিক্ষা নয়। তাই তিনি থেকে গেলেন। পাকিস্তানি সেনারা আস্তানা ঘিরে ফেললেও তাঁর চোখে ছিল অদ্ভুত প্রশান্তি। কোনো অনুনয় নয়, কোনো আতঙ্ক নয়। মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন।

ব্রাশফায়ারে ঝরে গেল তাঁর জীবন। সঙ্গে শহীদ হলেন তাঁর আরও আটজন সহচর। গোলাপনগরের মাটি সেদিন ভিজে গেল একজন প্রকৃত সুফি সাধকের পবিত্র রক্তে।

সোলাইমান শাহ প্রমাণ করে গেলেন—ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানিরা যা করছিল, তা ছিল নিছক ভণ্ডামি। প্রকৃত ধার্মিকেরা জীবন দিয়ে দেখিয়ে দেন, দেশপ্রেমই ঈমানের চূড়ান্ত পরীক্ষা।

তবে পীর-মাশায়েখরা শুধু শহীদ হয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি। তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন প্রতিরোধের এক অদৃশ্য দুর্গ।

চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ একাত্তরে পরিণত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের এক বিশাল লজিস্টিক হাবে। পাকিস্তানি সেনাদের টহলের মধ্যেই ৫ এপ্রিল মাইজভাণ্ডারের ওরসে হাজারো মানুষের সামনে উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।

এই ঘটনা ছিল এক মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। দরবারের পুকুরের মাছ, গোয়ালের গরু আর গোলার ধান উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য।

ফটিকছড়ির মতিভাণ্ডার দরবার কার্যত সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টারের ভূমিকা পালন করেছিল। এই দরবারগুলো ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়—সেফ হ্যাভেন।

পাকিস্তানিরা যখন মুক্তিযোদ্ধাদের ‘কাফের’ আখ্যা দিয়ে মনোবল ভাঙতে চাইত, তখন পীরেরা যোদ্ধাদের মাথায় হাত রেখে বলতেন—‘তোমরা হকের পথে আছ, বিজয় তোমাদেরই হবে।’ এই আধ্যাত্মিক শক্তি রণাঙ্গনে ছিল পারমাণবিক শক্তির চেয়েও প্রবল।

দেওয়ানবাগী হুজুর: স্টেনগান হাতে এক সুফি

একাত্তরের রণাঙ্গনের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়টি জড়িয়ে আছে দেওয়ানবাগী হুজুরকে ঘিরে। আজকের সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা সহজ, কিন্তু ইতিহাসে তাঁর অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তাঁর নাম ছিল মাহবুব-এ-খোদা। একাত্তরে তিনি হাতে তুলে নিয়েছিলেন থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল আর স্টেনগান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করলেও তিনি বুঝেছিলেন—শুধু সেবা দিয়ে এই পিশাচদের থামানো যাবে না।

তিনি যোগ দেন ৩ নম্বর সেক্টরে। মেজর কে এম সফিউল্লাহর অধীনে একটি প্লাটুনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৬ এপ্রিল শাহবাজপুরের যুদ্ধ, মে মাসে সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়কের অ্যামবুশ, মাধবপুর ও মনতলা-হরষপুরের সম্মুখ সমরে তিনি ছিলেন অগ্রভাগে।

তাঁর সাহস ও রণকৌশলে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিয়মিত সেনাবাহিনীতে কমিশনড অফিসার হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন—
‘আমি আলেম। যুদ্ধে এসেছি দেশকে মুক্ত করতে, পেশা নিতে নয়। দেশ স্বাধীন হলে আমি ধর্মকর্মে ফিরে যাব।’

১৯ নভেম্বর, ঈদের দিন। ভারতের হেজামারা ক্যাম্পে ঈদের জামাতে ইমামতি করতে গিয়ে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন—
‘আগামী কোরবানির ঈদ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে করব। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সেই নামাজ পড়াব আমি।’

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। আর ১৯৭২ সালের ২৬ জানুয়ারি, ঠিক সেই রেসকোর্স ময়দানেই ঈদের জামাতে ইমামতি করেন মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব-এ-খোদা।

এটাই ছিল এক সুফি সাধকের ‘স্টেনগান থেকে জায়নামাজ’ যাত্রা।

আরও পীর, আরও প্রতিরোধ

গবেষণায় দেখা যায়—সুনামগঞ্জের পাগলা পীর, ছাতকের পীরেরা, ফরিদপুরের আটরশি দরবার, দিনাজপুরের পীর এঙ্গোজ শাহ—অসংখ্য সুফি ও পীর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।

মাওলানা ভাসানী ছিলেন পীর ও রাজনীতিক—যাঁর মুরিদরাই কাদেরিয়া বাহিনীর মেরুদণ্ড গড়ে তোলে।

অন্যদিকে শর্ষিণার পীর বা জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক ধর্মীয় গোষ্ঠী পাকিস্তানের পক্ষে ফতোয়া দিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত সুফিরা কখনোই শোষকের পাশে দাঁড়াননি।

একাত্তরের যুদ্ধ ধর্মের বিরুদ্ধে ছিল না। এটি ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের যুদ্ধ। পীরের রক্ত আর কৃষকের রক্ত একাকার হয়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে।

আজ ইতিহাস নতুন করে পাঠ করার সময় এসেছে। আমাদের জানা উচিত—এই স্বাধীন মানচিত্রের প্রতিটি ইটের ভেতর লুকিয়ে আছে তসবিহ ধরা সেই হাত, যারা প্রয়োজনে ট্রিগার চাপতেও দ্বিধা করেনি।

যাঁরা বলেন একাত্তরে সব আলেম-পীরই পাকিস্তানের দালাল ছিল—তাঁরা হয় ইতিহাস জানে না, নয়তো জেনেও চেপে যেতে চায়।

সত্য হলো—বাংলার সুফিবাদের মূল সুরই স্বাধীনতা। আর সেই স্বাধীনতার জন্য পীরেরা রক্ত দিয়েছেন, যুদ্ধ করেছেন, এবং সত্যিকার অর্থেই বাংলা মায়ের প্রাণ মুক্ত করেছেন।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025 Times News7
Theme Customized By BreakingNews