আলী রিয়াজ দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত আছেন ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ‘অ্যাটলান্টিক কাউন্সিল’-এর সঙ্গে। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক, সামরিক সহযোগিতা ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের জন্য নীতিগত সহায়তা দিয়ে থাকে।
অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের অর্থায়নের উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি (NED), ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (USAID) এবং কিছু বেসরকারি কৌশলগত তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণ করে। এসব সংস্থা মূলত মার্কিন সরকারের বাজেট থেকেই পরিচালিত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনৈতিক লক্ষ্য পূরণের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশে “গণতন্ত্র ও সুশাসনের উন্নয়ন” নামে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে থাকে।
NED-এর ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস কর্তৃক অর্থায়িত এই সংস্থাটি সরাসরি মার্কিন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্য কাজ করে।
USAID–ও একইভাবে মার্কিন সরকারের বৈদেশিক সহায়তা সংস্থা হিসেবে পরিচিত, যা “উন্নয়ন সহায়তা”র নামে এমন প্রকল্পগুলোকে অর্থায়ন করে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই নেটওয়ার্ক থেকেই আলী রিয়াজ বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে, NED সরাসরি তাঁর দুটি গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই প্রকল্পগুলো একাডেমিক গবেষণার চেয়ে বেশি “ইন্টেলিজেন্স কালেকশন”—অর্থাৎ গোয়েন্দা তৎপরতার বৈশিষ্ট্য বহন করে।
বাংলাদেশে বিদেশি তহবিলপ্রাপ্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর মধ্যে কিছু গোষ্ঠী বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। বিশেষ করে USAID, NED ও ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI) থেকে অর্থ পাওয়া সংগঠনগুলোই একসময় অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই গোষ্ঠীগুলো মূলত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে আন্তর্জাতিকীকরণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শক্তিকে সুবিধা দিতে চায়। তাদের প্রচার ও কর্মকাণ্ডে দেখা যায়, একদিকে তারা “গণতন্ত্র ও সংস্কার”–এর কথা বললেও অন্যদিকে দেশের সংবিধান ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় বিদেশি ধারণা ও শর্ত চাপিয়ে দিতে আগ্রহী।
আরও বিতর্কিত তথ্য হলো—এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কিছু ব্যক্তি জামায়াত–শিবির ঘরানার রাজনীতির প্রতি সহনশীল বা সহানুভূতিশীল। বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াত ইসলাম যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা নিয়েছিল, তা সত্ত্বেও এই বিদেশি অর্থায়নপ্রাপ্ত অংশ তাদের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যোগাযোগ রাখছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একজন মার্কিন নাগরিক, যিনি মার্কিন সরকার-অর্থায়নকৃত একটি থিংক ট্যাঙ্কের সদস্য—তিনি যখন বাংলাদেশের সংবিধান, রাজনৈতিক সংস্কার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য দেন, তখন সেটি নিছক একাডেমিক বিশ্লেষণ নয়—বরং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে বিদেশি হস্তক্ষেপের চিত্র হয়ে দাঁড়ায়।
আলী রিয়াজের প্রকাশিত লেখাগুলোতে প্রায়ই দেখা যায়, তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে পশ্চিমা দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করেন এবং অনেক সময় এমন মন্তব্য দেন, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি অর্থায়নের মাধ্যমে পরিচালিত গবেষণা প্রকল্পগুলো সচরাচর নীতিনির্ধারণে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে কাজ করে। তবে যখন সেই গবেষণার প্রভাব সরাসরি একটি দেশের সংবিধান বা নির্বাচনী কাঠামো পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন তা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ তৈরি করে।
বাংলাদেশে বিদেশি রাজনৈতিক প্রভাব নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়ে পশ্চিমা দাতা সংস্থা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও মানবাধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলো দেশের নীতিনির্ধারণে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এবার বিতর্কের বিষয় হলো—এই প্রভাব এখন সরাসরি সংবিধান পুনর্বিন্যাস ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সংবিধান একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। এই কাঠামো পরিবর্তনের যেকোনো উদ্যোগ শুধুমাত্র জনগণ ও দেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই হওয়া উচিত। কোনো বিদেশি নাগরিক বা বিদেশি সংস্থার প্রভাব এতে অনভিপ্রেত এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী।
বাংলাদেশে কর্মরত কিছু এনজিও, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি—যারা USAID বা NED–এর অর্থায়নে পরিচালিত—তাদের ভূমিকা নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করেন, তারা বিদেশি স্বার্থে “নীতি–আলোচনার নামে” রাজনৈতিক বার্তা প্রচার করছে।
যে সময় অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় এবং “সংস্কার–সংলাপ” শুরু হয়, সেই সময় এই গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম বিশেষভাবে সক্রিয় হয়। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার মধ্য দিয়ে তারা কার্যত একটি বিদেশি কৌশল বাস্তবায়নের অংশ হয়ে পড়েছিল বলে সমালোচকরা মনে করেন।
একজন মার্কিন নাগরিক যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা সংস্থার হয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন, তখন তা নিছক মতামত নয়—বরং রাষ্ট্রীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এখন প্রয়োজন তিনস্তরের সতর্কতা—
১. আইনগত প্রতিরোধ: বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা ও কার্যক্রমের উপর কঠোর নজরদারি।
২. জনসচেতনতা বৃদ্ধি: সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে, “গবেষণা” ও “নীতি প্রভাব”–এর আড়ালে কীভাবে বিদেশি স্বার্থ কাজ করে।
৩. রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক ভারসাম্য: উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি জাতীয় সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় কোনো বিদেশি প্রভাব যেন না পড়ে, তা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের সংবিধান, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র বাংলাদেশের নাগরিকদের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হবে—এটি দেশের স্বাধীনতার মূল দর্শন। বিদেশি সংস্থা বা তাদের অর্থায়িত ব্যক্তি যদি সেই প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তবে তা সার্বভৌমত্বের জন্য বিপজ্জনক।
আলী রিয়াজের মতো প্রবাসী নাগরিকদের মতামত একাডেমিক পর্যায়ে মূল্যবান হতে পারে, কিন্তু যখন সেই মতামত বিদেশি অর্থায়নের ছায়ায় নীতি প্রণয়নে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন সেটি “গবেষণা” নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের উচিত এই প্রভাবের উৎস ও এর স্থানীয় দোসরদের চিহ্নিত করে সতর্ক থাকা। কারণ, আমাদের সংবিধান, আমাদের রাষ্ট্রকাঠামো ও আমাদের ভবিষ্যৎ—এগুলো নির্ধারণের অধিকার শুধুমাত্র বাংলাদেশের জনগণের হাতে থাকা উচিত, কোনো বিদেশি শক্তির হাতে নয়।