কিন্তু মাত্র নয় বছর পর সেই একই সংস্থার প্রতিবেদনে রাজশাহীর নাম উঠেছে সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকার শীর্ষে। যে শহর একসময় ছিল স্বচ্ছ আকাশের প্রতীক, সেখানে এখন নিঃশ্বাস নেওয়াই হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ।
গত ২১ অক্টোবর রাজশাহীর বায়ুমান সূচক (AQI) রেকর্ড করা হয় ১৬৭, যা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী অস্বাস্থ্যকর। একই দিনে খুলনায় এ সূচক ছিল ১৫৭ এবং ঢাকায় ১০২। অর্থাৎ, একসময় নির্মল বাতাসের জন্য বিখ্যাত রাজশাহী এখন জনবহুল ঢাকাকেও ছাড়িয়ে গেছে দূষণে।
ভদ্রা, শিরোইল, সাহেববাজার থেকে সোনাদিঘী—পুরো শহরই এখন ধুলায় আচ্ছন্ন। ফ্লাইওভার ও ভবন নির্মাণের বালু, ইট ও খোয়া পড়ে আছে খোলা জায়গায়। পুরোনো বাস, ট্রাক ও অটোরিকশা থেকে বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া, যা বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে পিএম ২.৫ (PM2.5) নামের অতিক্ষুদ্র কণা। এই কণাগুলো সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করে শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করছে।
পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, রাজশাহীতে বড় কোনো শিল্পকারখানা না থাকলেও অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ ও যানবাহনের ধোঁয়াই এখন প্রধান দূষণের কারণ। রাস্তায় খোলা জায়গায় বালু রাখা হচ্ছে, কিন্তু পানি ছিটানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে বাতাসে ধুলিকণার পরিমাণ বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
বহরমপুর এলাকার গৃহবধূ জান্নাত আরা বলেন,
“সকাল-বিকাল জানালা খুললেই ঘরে ধুলা ঢুকে পড়ে। আমার ছেলে অনেক দিন ধরে কাশছে। ডাক্তার বলেছেন, এটা দূষিত বাতাসের কারণে। জানালা বন্ধ রাখলেও মুক্তি নেই।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শংকর কে রায় সতর্ক করে বলেছেন, “রাজশাহীর মতো শহরে এমন বায়ুদূষণ অকল্পনীয়।”
তিনি বলেন, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট এমনকি হৃদরোগও বাড়বে যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়।
যানবাহনের ধোঁয়া নির্গমনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকলেও তা কার্যকর নয়।
নূরে আলম সিদ্দিকী, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার বলেন,
“বাস-ট্রাকের বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে মোটরসাইকেলের ধোঁয়া পরীক্ষার নিয়ম নেই, এটা বিআরটিএর দায়িত্ব।”
বিআরটিএর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,
“আমাদের কাছে ধোঁয়া পরীক্ষার যন্ত্র নেই। চোখে দেখেই ফিটনেস সার্টিফিকেট দিতে হয়। ঢাকার বাইরেও এসব যন্ত্র নেই।”
বাতাসের মান খারাপ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) এক জরুরি বৈঠক করে। সেখানে ফ্লাইওভার, সড়ক ও ভবন নির্মাণের কারণে সৃষ্ট ধুলো নিয়ন্ত্রণে করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
মাহমুদ-উল-হাসান, রাসিকের পরিবেশ উন্নয়ন কর্মকর্তা বলেন,
“এটা সত্যিই দুঃখজনক। এখন শহরে একাধিক ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। ধুলো কমাতে পানি ছিটানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে পরিস্থিতি উন্নতি হবে বলে আশা করছি।”
তবে নগরবাসীর প্রশ্ন—“যদি কাজ শেষ হতে আরও এক বছর লাগে, ততদিন আমরা কীভাবে শ্বাস নেব?”
তরুণ পরিবেশকর্মী তফাজ্জল হোসেন বলেন,
“২০১৬ সালে রাজশাহী ছিল বিশ্বের সবচেয়ে পরিষ্কার বাতাসের শহর। কিন্তু আজ সেই শহরেই মানুষকে দূষণ সতর্কতা শুনতে হচ্ছে। নগর পরিকল্পনা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ আর নির্মাণ শৃঙ্খলায় পরিবর্তন না আনলে রাজশাহী টিকবে না।”
যে শহরের মানুষ একসময় গর্ব করত তার স্বচ্ছ আকাশ ও নির্মল বাতাস নিয়ে, আজ সেই শহরে মানুষ হাঁটে মুখে মাস্ক পরে, শিশুরা কাশে, আর আকাশ ঢাকা থাকে ধোঁয়ায়।
যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে রাজশাহীর নির্মল বাতাস একদিন ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে।