ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) চুক্তি থেকে বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) বাদ দেওয়ার ঘটনায় দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কে এক নজিরবিহীন টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশে অভিজ্ঞ এই পেসারকে চুক্তি থেকে মুক্ত করা হয়, যার ফলে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে ভারতেই যাবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ দল। এমনকি, দেশে আইপিএল সম্প্রচারেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।
গত মাসেই অনেক দর কষা-কষির পর নিলামে ৯.২০ কোটি রুপিতে মুস্তাফিজকে কিনেছিল কেকেআর। সেই তারকাকে ছেড়ে দিতে হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা বিসিসিআইয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিসিসিআই বা আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সব সদস্যের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি!
গতকাল ভারতেরই জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে উদ্ধৃত করে একজন বিসিসিআই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা নিজেরাই গণমাধ্যম মারফত এই খবর জানতে পারি। কোনো আলোচনা হয়নি। আমাদের দিক থেকে কোনো পরামর্শও নেওয়া হয়নি।’ অথচ, গত শনিবার বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া যখন এই সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন তখন তিনি জানান, ‘সর্বত্র চলমান সাম্প্রতিক ঘটনাবলির কারণে’ বিসিসিআই কেকেআরকে মুস্তাফিজুর রহমানকে স্কোয়াড থেকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এদিকে, ভারত যখন ‘নিরাপত্তা হুমকি’ দেখিয়ে মুস্তাফিজকে বাদ দেয়, ঠিক সেই শঙ্কায় ভারতে আনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ টি- টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ। কারণ জিসেবে বিসিবি জানিয়েছে, ভারতের কিছু রাজনৈতিক ও উগ্র ধর্মীয় সংগঠনের হুমকির মুখে তারা এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে কলকাতা বা মুম্বাইয়ে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে গিয়ে বাংলাদেশ দল কতটা নিরাপদ থাকবে? যেখানে এক মুস্তাফিজের নিরাপত্তা নেই, সেখানে খেলোয়াড়, কোচ ও সংবাদকর্মীসহ বিশাল বহরের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কোথায়!’
সেদিনই আইসিসিকে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে বিসিবি। শুধু তাই নয়, যেই আইপিএলে মুস্তাজিুর রহমানের মতো বিশ্বমানের পেসারের খেলতে বাধা সেই আইপিএলই বাংলাদেশে সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বাংলাদেশ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশের এমন প্রতিবাদে সরব হয়ে ওঠার পর খোদ ভারতেই বিসিসিআই কিংবা দেশটির সরকারের সংশ্লিষ্টদের সমালোচনা চলছে। আর্থিক ক্ষতি তো রয়েছেই, বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন শুরু হয়ে যাওয়ায় টনক নড়েছে ভারতের। তাই বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে তাদের মাটিতে খেলতে রাজি করাতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নিরাপত্তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে ভারত। সম্প্রতি একটি সূত্রের বরাতে এই তথ্য প্রকাশ করেছে ভারতের একটি গণমাধ্যম। সেই সাথে গতকালের সভায় আইসিসির মাধ্যমে বিসিসিআই একটি বিশেষ প্রস্তাব দিতে পারে বিসিবিকে বলে শোনা যাচ্ছে। তবে সেই প্রস্তাবে রাজি হবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
গতকাল সোমবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শোকবইয়ে স্বাক্ষর করতে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে যান বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল। সেখানে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলা নিরাপদ বোধ করছি না। আমরা চিঠিতে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছি কী বলতে চাইছি। আমাদের মনে হয়েছে সেটা (নিরাপত্তা) একটা বড় দুশ্চিন্তা।’
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও নির্দেশনা রয়েছে যে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলাদেশ দল যেন ভারত সফর না করে এবং ম্যাচগুলো যেন অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ও বিসিবির এমন অনড় অবস্থান বিসিসিআইকে বড় ধরনের সাংগঠনিক চাপে ফেলেছে। আয়োজক দেশ হিসেবে সবার অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব হলেও বর্তমান আইসিসি প্রধান জয় শাহর পক্ষে এই চাপ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এরই মধ্যে বাংলাদেশের ভেন্যু পরিবর্তনের প্রস্তাবে আইসিসি ইতিবাচক সাড়া দিয়ে নতুন সূচি তৈরির কাজও এগিয়ে নিচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।