এই আবেদনটি জাতিসংঘের বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ দূত এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিষয়ক বিশেষ দূতের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, আবেদনপত্রে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে চলমান বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দুই আইনজীবী উল্লেখ করেছেন, এ বিচার প্রক্রিয়ায় ‘ন্যায়বিচারের অধিকার ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া’ লঙ্ঘনের একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারাধীন রয়েছেন। তবে তার অনুপস্থিতিতে পরিচালিত এই বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
ব্রিটিশ আইনজীবীরা তাদের আবেদনে বলেছেন, এই বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির (ICCPR) বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘিত হচ্ছে।
এদিকে আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নিপীড়ন চালাচ্ছে।
দলটির পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আদালতে একাধিক অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।
গত মাসের শেষ দিকে নেদারল্যান্ডসের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)–এ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যাকাণ্ড, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে একটি মামলা দাখিল করা হয়।
এই মামলার আবেদনও করেন স্টিভেন পাওলস কেসি, যিনি এবার শেখ হাসিনার পক্ষে জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয়েছেন।
এদিকে শেখ হাসিনার সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন জাতিসংঘে একটি চিঠি পাঠিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন।
তিনি ২৮ অক্টোবর জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের (UNHRC) প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলেন, বর্তমান সরকার ‘রাজনৈতিক নিবর্তন, গুম, সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা, অপরাধীদের দায়মুক্তি ও সাংবাদিক নির্যাতন’ চালাচ্ছে।
মোমেন নিজেও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যা এই বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক মহলে আরও গুরুত্ব এনে দিয়েছে।
আইনজীবী কেসি ও ইটওয়েল তাদের আবেদনে উল্লেখ করেন, বর্তমান ট্রাইব্যুনাল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিচার করলেও যারা অভ্যুত্থানের পক্ষে ছিল, তাদের বিচার করছে না।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত অপরাধের বিচার বন্ধ রাখা হয়েছে, যা ‘পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন তারা।
তাদের মতে, বিচার প্রক্রিয়াটি ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি এমন একটি অনির্বাচিত সরকারের অধীনে চলছে, যার কোনো জনসমর্থন বা গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট নেই।
আইনজীবীরা শেখ হাসিনার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন—
১. আইসিসিপিআর (ICCPR) সনদের ১৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একজন অভিযুক্তের বিচার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে হওয়ার কথা। কিন্তু শেখ হাসিনার মামলায় এই নীতি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
২. বিচারকদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে, যাদের মধ্যে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের বিরোধী দলের সঙ্গে সম্পর্কিত।
৩. শেখ হাসিনার প্রধান আইনজীবীও রাজনৈতিকভাবে টার্গেট হয়েছেন; তার বিরুদ্ধে হুমকি, হয়রানি ও আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে।
৪. মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিচার চলছে তার অনুপস্থিতিতেই, অথচ তার কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিস পাঠানো হয়নি।
৫. অতীতে আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করা আইনজীবীদের ওপরও হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
আইনজীবীরা আরও বলেন, এই ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়া যদি মৃত্যুদণ্ডের মতো রায় দেয়, তবে তা হবে আইসিসিপিআরের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখিত বেঁচে থাকার অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর দমননীতি চালানোর অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও নিপীড়নের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশ পেয়েছে।
আইনজীবীরা তাদের আবেদনে উল্লেখ করেন, এই সরকার এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমতের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
তারা দাবি করেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেভাবে মামলা পরিচালিত হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকারবিরোধী।
স্টিভেন পাওলস কেসি ও তাতিয়ানা ইটওয়েল জাতিসংঘের কাছে আবেদন করে বলেন, শেখ হাসিনার বিচারে ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলো লঙ্ঘিত হচ্ছে।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়া শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ এবং এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
আইনজীবীরা জাতিসংঘকে অনুরোধ করেছেন, বিষয়টি নিয়ে জরুরি তদন্ত শুরু করতে এবং শেখ হাসিনার আইনি অধিকার রক্ষায় অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে।
তাদের মতে, এই বিচার কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকারের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা।