সবুজ ঋণের নামে ৩০ হাজার কোটি টাকা বিতরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যয় সামান্যই

, বাংলাদেশ

সবুজ ঋণের নামে ৩০ হাজার কোটি টাকা বিতরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যয় সামান্যই

পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং জলবায়ু-সহনশীল প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিলেও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো তা অন্য খাতে ব্যয় করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই অর্থবছরে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অন্তত ৩০ হাজার ৩৬৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। বছর শেষে এই খাতে বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭ হাজার ১৪০ কোটি ২২ লাখ টাকা। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ব্যাংকগুলোর ছাড় করা এই অর্থের মাত্র ৭.৮৪ শতাংশ প্রকৃত অর্থে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়েছে। বাকি অর্থের বড় একটি অংশ অজ্ঞাত খাতে চলে গেছে।

সবুজ ঋণের এই অর্থ শুধুমাত্র সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকেনি; গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, চালকল ও টিম্বার মিলের মতো বিভিন্ন শিল্পেও তা দেওয়া হয়েছে। নজরদারির অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান সবুজ কারখানা তৈরির কথা বলে ঋণ নিয়ে তা কারখানা সম্প্রসারণে ব্যয় করেছে। আবার কেউ কেউ সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের আড়ালে ঋণ নিয়ে ভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। ২০২১ সালে সবুজ অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ২৩২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, যা চার বছরে চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। অথচ দেশের জ্বালানি অবকাঠামো বা বিদ্যুৎ সংকটে এর তেমন কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মেটানোর কথা। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এসআরইডিএ)-এর নীতিমালাতেও ২০২৬-৩০ মেয়াদে ২০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সক্ষমতা এই লক্ষ্যের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ২০২৫ সালে সবুজ অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৭ হাজার ৮২০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যার বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৪৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। অন্যদিকে, জ্বালানি ও সম্পদ দক্ষতা খাতে ৩১ হাজার ৯৩১ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠানে ১৬ হাজার ৫২৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, যা মোট ঋণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।

জ্বালানি অর্থনীতি ও আর্থিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান (আইইইএফএ)-এর বাংলাদেশ বিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম জানান, সবুজ অর্থায়ন বাড়লেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনো পোর্টফোলিওর মাত্র ৮ শতাংশ। ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৯৩৩ থেকে ৯৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে, যেখানে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বার্ষিক গড় বিনিয়োগ ছিল মাত্র ২৩৮ মিলিয়ন ডলার। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন খান মনে করেন, অর্থের অভাব নয়, বরং নীতিগত ঘোষণা ও আর্থিক বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবেই এই রূপান্তর বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতাও একই রকম। খানটেক্স কম্পোজিট টেক্সটাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির সালিম জানান, ১ মেগাওয়াট ছাদ সৌর প্রকল্পের জন্য ৬ কোটি টাকা ঋণের আবেদন করে তিনি চার-পাঁচটি ব্যাংকে ঘুরেছেন। সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করলেও বারবার কাগজপত্র চাওয়ার জটিলতায় শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিল করতে হয়েছে। ব্যাংকগুলোর সবুজ অর্থায়ন পোর্টফোলিওতে স্পেকট্রা সোলার পার্ক, ইকোটেক্স, ফারিহা স্পিনিং, থার্ম্যাক্স ইয়ার্ন ডাইং, প্লামি ফ্যাশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেও ঋণের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ঋণগ্রহীতাদের পূর্ণ তালিকা বা প্রকল্পভিত্তিক সুনির্দিষ্ট ব্যয়ের হিসাব নেই। কোন প্রতিষ্ঠান কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে বা কতটুকু জীবাশ্ম জ্বালানি প্রতিস্থাপন করতে পারছে, তার স্বচ্ছ তথ্যের অভাব রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ব্যাংক ও প্রকল্পভিত্তিক একটি উন্মুক্ত ড্যাশবোর্ড তৈরি করা, যেখানে ঋণের পরিমাণ, মেয়াদ, সুদহার এবং প্রকল্পের বর্তমান অবস্থার মতো তথ্যগুলো নিয়মিত প্রকাশ করা হবে। কেবল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলেই সবুজ ঋণের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হওয়া সম্ভব। চাকরির আরও তথ্য: তবে প্রয়োজনীয় নজরদারি না থাকায় অনেকে সবুজ কারখানা করার কথা বলে লোন নিয়ে তা কারখানা বর্ধিত করার কাজে ব্যবহার করেছেন। চাকরির আরও তথ্য: বাংলাদেশ যখন আমদানি করা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মুখে রয়েছে। চাকরির আরও তথ্য: তখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাংক ঋণের এই বৈষম্য শুধু জলবায়ু নীতির সমস্যা নয়। চাকরির আরও তথ্য: এটি ক্রমেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও পরিণত হচ্ছে। চাকরির আরও তথ্য: বিশেষ করে কতটি ছাদ সৌর প্রকল্প ঋণ পেয়েছে, কত টাকা পেয়েছে এবং প্রকল্পগুলো বাস্তবে কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করছ্তেএসব তথ্য এক জায়গায় না থাকায় অর্থায়নের কার্যকারিতা যাচাই কঠিন। চাকরির আরও তথ্য: সমস্যাটি শুধু অর্থের অভাব নয়; বরং অর্থায়ন কাঠামো, প্রকল্প মূল্যায়ন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, জামানত এবং পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থার জটিলতা নবায়নযোগ্য প্রকল্পকে পিছিয়ে দিচ্ছে। চাকরির আরও তথ্য: কোন ব্যাংক কত ঋণ দিলো: ২০২৫ সালে ইস্টার্ন ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন ছিল ১ হাজার ৯৩৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।