নদী দখল ও দূষণ: জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি

, স্বাস্থ

নদী দখল ও দূষণ: জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি

রাজধানীর সন্নিকটে ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে চরকুন্দনিয়া গ্রাম। এই গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব দিলবর হোসেন ছোটবেলা থেকেই নদীনির্ভর জীবন কাটিয়েছেন। একসময় যে ধলেশ্বরীতে মাছ ধরে রাতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব ছিল, আজ সেখানে মাছের আকাল। দিলবর জানান, একসময় বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, রুই, কাতলা, বাইন, বেলে, ট্যাংরা, ইঁচা, গলদা, জাটকা, পোয়া ও কাজরির মতো মাছ প্রচুর পাওয়া যেত। এখন নদী ভরাট হয়ে স্রোতহীন হয়ে পড়েছে, আর শিল্পবর্জ্যের কারণে পানি বিষাক্ত হওয়ায় মাছের দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে বুড়িগঙ্গা থেকে আসা পচা পানি নদীতে মিশে মাছ মরে ভেসে ওঠার দৃশ্য নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে মহাসড়ক ধরে পদ্মা সেতুর দিকে যেতে পার হতে হয় বুড়িগঙ্গা সেতু। সেতু দুটির নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে ধলেশ্বরী। ধলেশ্বরীর দুই শাখার মধ্যে চরে গড়ে ওঠা বেশ কয়েকটি গ্রামের একটি চরকুন্দনিয়া। এক ছেলে কুয়েত থাকেন, দুই ছেলে বাড়িতে মুরগির খামার দেখেন, দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে ধলেশ্বরীতে মাছ ধরতে যান। অগ্রহায়ণ মাসে নদীতে নিয়মিত মাছ ধরার প্রস্তুতি নিতে কিনেছেন নতুন নৌকা।

আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নদী দিবস পালিত হচ্ছে। অথচ দেশের নদ-নদীগুলো দখল ও দূষণের কবলে পড়ে মরণদশায় উপনীত হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৮টি এবং প্রতিটি জেলার ওপর দিয়ে গড়ে ১৬টি নদী প্রবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলায় নদীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৯৭টি। এই নদীগুলোর নান্দনিক মূল্য হারিয়ে যাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী। তার মতে, নদী যত বিপর্যস্ত হবে, পানিবাহিত রোগ যেমন—ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসের ঝুঁকি তত বাড়বে। এরপর কাছাকাছি আরও দুটি সেতু পরপর: ধলেশ্বরী ১ ও ধলেশ্বরী ২। সংসার চালানোর দায়িত্ব পুরোপুরি নিজের ওপর নেই।

শিল্পায়নের নামে অপরিকল্পিত উন্নয়ন নদীদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। ঢাকার চারপাশের ১১টি শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৭ হাজার কলকারখানা রয়েছে, যেগুলোর বর্জ্য পরিশোধনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিন প্রায় ৬০ হাজার ঘনমিটার টেক্সটাইল, ডাইং, প্রিন্টিং ও ওষুধের বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি খাল ও নদীতে মিশছে। এর পাশাপাশি হাজার হাজার নৌযান থেকে নিঃসৃত তেল ও তরল বর্জ্য নদীর পানিকে আরও দূষিত করছে। বিশেষ করে ধলেশ্বরী নদীতে ট্যানারির বর্জ্য ফেলার ফলে উচ্চমাত্রার ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খালিকুজ্জামান জানান, নদীর পানিতে থাকা ক্রোমিয়াম মানুষের শরীরে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করে।

দূষণের শিকার হয়ে মাছের শরীরেও জমছে ভারী ধাতু। মেঘনা নদীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় ১৫ ধরনের মাছের নমুনায় সিসা, ক্রোমিয়াম, তামা, দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ, লোহা, পারদ, নিকেল, ক্যালসিয়াম, কোবাল্ট, সেলেনিয়াম ও রুবিডিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালে টক্সিক জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, লোহা, দস্তা, তামা, পারদ ও নিকেলের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি। যদিও দূষিত মাছ খেয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো রোগ বিস্তারের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি, তবুও জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

নদীর বিপর্যয় কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে না, বরং তা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০১৯ সালে রাজশাহী ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ৬১১টি পরিবারের ওপর করা জরিপে দেখা গেছে, নদীভাঙনের শিকার হওয়া পরিবারগুলোর সদস্যদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের হার অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। নদী শুকিয়ে যাওয়া বা বিষাক্ত হয়ে পড়ার কারণে মানুষ তার নান্দনিক আশ্রয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—যেমন নৌকাবাইচ ও নদীভ্রমণ—থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নদী কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে যাওয়ার ফলে সমাজে যান্ত্রিকতা ও নান্দনিক শুষ্কতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য বড় ঝুঁকি।”