মধ্যপ্রাচ্যে আরও ১০ হাজার সেনা ও রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

, বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যে আরও ১০ হাজার সেনা ও রণতরি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি নতুন মোড় নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সেনা, যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের প্রক্রিয়া চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তেহরানকে মানসিক চাপে রাখা অথবা চুক্তির আলোচনার টেবিলে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। তবে এটি কোনো বড় ধরনের হামলার পূর্বাভাস কি না, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, যেকোনো পরিস্থিতির জন্য মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। যদিও পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকেও ট্রাম্প এ ধরনের সামরিক তৎপরতা দেখাতে পারেন। সেই নির্বাচনে নিজের পতনশীল ইমেজ কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হিসেবে ট্রাম্প এমন প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে পারেন। আল জাজিরাকে এক মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। যুদ্ধ পরিচালনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক অজনপ্রিয় হয়ে পড়া প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি এই নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি বহর মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তারা। এরই অংশ হিসেবে রোববার ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ঘাঁটি ত্যাগ করেছে ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট। এর ঠিক একদিন পরেই যাত্রা করেছে মেকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট, যার সদস্য সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, সব মিলিয়ে এই অতিরিক্ত মোতায়েনের ফলে ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার নতুন মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্ত হতে যাচ্ছে। নভেম্বরের শেষ নাগাদ ওই অঞ্চলে মোট তিনটি বিমানবাহী রণতরি ও দুটি উভচর অবতরণকারী বহর অবস্থান করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিস্তৃত বিকল্প হাতে দেবে।

এ নতুন বহরে এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগে থেকেই ওই অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। পেন্টাগনের সূত্র অনুযায়ী, কূটনৈতিক আলোচনা যেদিকেই মোড় নিক, সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পগুলো খোলা রাখতেই এ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট করেছেন যে, নির্দেশ পেলে লড়াইয়ে নামার পূর্ণ প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১৯টি স্থানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির নেটওয়ার্ক রয়েছে, যার মধ্যে বাহরাইন, সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলোতে স্থায়ী ঘাঁটিগুলো অন্যতম। ১৯৫৮ সালে লেবানন সংকটের সময় থেকে শুরু করে বর্তমানেও অঞ্চলটিতে বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন বজায় রেখেছে ওয়াশিংটন। ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, এ নতুন মোতায়েনে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে।

চলতি বছরের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়াতে তৎপর ট্রাম্প প্রশাসন। ফেব্রুয়ারির পর থেকে প্রায় ১২০টির বেশি বিমান মোতায়েন করা হয়েছে, যা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মার্কিন বিমানশক্তির সবচেয়ে বড় বিস্তার। এর মধ্যে ই-৩ সেন্ট্রি অ্যাওয়াকস, এফ-৩৫, এফ-২২ এর মতো উন্নত যুদ্ধবিমান রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাধারণ রদবদল নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী অভিযানের প্রস্তুতি। মার্চের দিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা তিনটি ইউনিটের মধ্যে ছিল ইউএসএস ত্রিপোলি ও ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট এবং ইউএসএস বক্সার ও ১১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট। এই দুই ইউনিট মিলে অতিরিক্ত ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিক যোগ করেছে। এছাড়া উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় ২ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, সব মিলিয়ে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অতিরিক্ত প্রায় ৭ হাজার সেনার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ অষ্টম মাসে প্রবেশ করেছে।

নতুন এই মোতায়েন ও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে বলেছেন, এটি বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই। তবে টাইম ম্যাগাজিনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নির্বাচনের পর ইরানে বড় ধরনের বোমা হামলার সম্ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অন্যদিকে, তেহরান সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার শর্তসাপেক্ষ প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখান করেছে। ওয়াশিংটন চায় পারমাণবিক ইস্যুসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও আলোচনায় আসুক। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বাড়ানো এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর চেষ্টা একই সঙ্গে চলমান রয়েছে। ইরানের চারপাশ আবার ঘিরে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে সংঘাত আরও বাড়ানো এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ দুই পথই বিবেচনা করছে উভয় পক্ষ।