বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অপরাধের পরিধি ও ধরন ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। একসময় চাঁদাবাজির একটি নির্দিষ্ট মানচিত্র থাকলেও বর্তমানে তা বিস্তৃত হয়েছে। সড়ক, ফুটপাত, কাঁচাবাজার কিংবা বাসস্ট্যান্ডের চিরাচরিত গণ্ডি পেরিয়ে এখন নতুন ব্যবসা বা বাসগৃহ নির্মাণেও মাস্তানদের দৌরাত্ম্য ও চাঁদা দাবির ঘটনা সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি একজন সাংবাদিকের পিতাকে ডেকে নিয়ে প্রাণনাশের হুমকি ও দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবির ঘটনা এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিরই প্রতিফলন। একসময় বাংলাদেশে চাঁদাবাজির একটি সুনির্দিষ্ট ও গতানুগতিক মানচিত্র ছিল। সড়ক-পরিবহন, ফুটপাত, কাঁচাবাজার, বাসস্ট্যান্ড, লেগুনা কিংবা সিএনজি-অটোরিকশার স্ট্যান্ড—এগুলোই ছিল চাঁদাবাজদের চিরাচরিত চারণভূমি। মুন্সীগঞ্জ শহরের একজন পেশাদার কাজী, যিনি দীর্ঘ দুই দশক ধরে সুনামের সঙ্গে নিকাহ্ রেজিস্ট্রি এবং বিবাহ বিচ্ছেদের আইনি কাজ পরিচালনা করে আসছেন, তাকে নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে অপহরণ করা হলো। বাধ্য হয়ে প্রাণরক্ষার্থে কাজী সাহেবকে ব্যাংকে গিয়ে নিজের জমা টাকা তুলে এনে অপহরণকারীদের হাতে তুলে দিতে হলো।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক নাহিদ হাসানের পরিবারের সাথে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক পরিস্থিতির নাজুক অবস্থারই ইঙ্গিত দেয়। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ভাষায়, সাংবাদিক পরিবার হওয়ার পরও যদি এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোন পর্যায়ে রয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। ঘটনার পর পুলিশ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং দাবি করা দুই লাখ টাকা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই বিচ্ছিন্ন ধরপাকড় বা প্রাতিষ্ঠানিক বহিষ্কারাদেশ চাঁদাবাজির মূল শিকড় উৎপাটনে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে মুন্সীগঞ্জে ঘটে যাওয়া একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা চাঁদাবাজির সেই ঐতিহ্যবাহী মানচিত্রকে এক ধাক্কায় বহুদূর প্রসারিত করে দিয়েছে। ভুক্তভোগী কাজী মো. হাবিবুর রহমানের আরেকটি পরিচয় হলো; তিনি জাতীয় দৈনিক ‘’-এর একজন তরুণ ও উদীয়মান মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার নাহিদ হাসানের পিতা।
বিগত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশে সরকার পরিবর্তন বা পতাকার রং বদলালেও চাঁদাবাজির খাত ও নেপথ্যের শক্তির কোনো পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন এবং প্রশাসনিক কঠোরতা ও নিয়মিত অভিযানের বার্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর কেবল চুনোপুঁটি গ্রেপ্তার বা নামকাওয়াস্তে বহিষ্কারাদেশের মাধ্যমে এই দুষ্টচক্র বন্ধ করা সম্ভব নয়। এটি অনেকটা সমস্যার লেজ ধরে টানার মতো, যা মূল সমস্যার সমাধান করে না।
এই চক্রাকারে আবর্তিত অপরাধ সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পেতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি টেবিলে বসে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে যে, অপরাধী ও চাঁদাবাজদের কোনো দলীয় পরিচয় থাকবে না। চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত কাউকে কোনো রাজনৈতিক দলে স্থান দেওয়া যাবে না। স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায় এই চাঁদাবাজি কেবল সামাজিক অপরাধ নয়, এটি দেশের অর্থনীতির ওপরও বড় আঘাত। ৫৬ বছর ধরে বাংলাদেশ এই ঘূর্ণিপাকের মধ্যে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানদের কঠোর অবস্থানের বাস্তব প্রতিফলন তখনই ঘটবে, যখন রাজনীতির গভীরে লুকিয়ে থাকা মূল সিন্ডিকেটটিকে উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে। সাংবাদিক নাহিদ হাসান ও তার পরিবার কেবল আইনি প্রতিকার নয়, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের দাবি জানাচ্ছেন। এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ের এক জরুরি প্রয়োজন। কোনো নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে কিংবা বসতবাড়ি নির্মাণ করতে গেলেও স্থানীয় মাস্তানদের দাবি মেটাতে হতো—এ ঘটনাগুলোর সঙ্গে দেশের মানুষ দীর্ঘকাল ধরে অভ্যস্ত।



