মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং বিশ্বব্যাপী উচ্চ সুদহারের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে সোমবার থেকে শুরু হয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলন। সাত দিনের এই আয়োজনে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকেরা অংশ নিচ্ছেন। ওয়াশিংটনের বাইরে তিন বছর পর আয়োজিত এই সভায় মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণের বোঝা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে বিশদ আলোচনা চলছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতি যে ভয়াবহ ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তবে তা কিছুটা কম হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি ও সারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং এল নিনোর মতো প্রতিকূল আবহাওয়া অর্থনীতির জটিলতাকে বাড়িয়ে তুলছে। এল নিনোর প্রভাবে তীব্র তাপপ্রবাহের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে চাপের সৃষ্টি করছে।
জ্বালানি সংকট নিরসনে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর জোট জি-৭ জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবির প্রেক্ষিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এর সমালোচনা করেছেন। এর পাশাপাশি ট্রাম্প রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টিও সামনে এনেছেন, যা জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ হতে পারে, তবে সংঘাতের কারণে এই প্রাক্কলন পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হতে পারে। আইএমএফ আরও সতর্ক করেছে যে, সরকারি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০৩০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক সরকারি ঋণের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশ অতিক্রম করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি উদীয়মান ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ সুদহার বজায় থাকায় এসব দেশ থেকে পুঁজি বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এসব দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈদেশিক ঋণ ব্যয়বহুল হওয়া উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি চাহিদা কমে গেলে এটি সরাসরি প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছে।
সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচির মধ্যে ১৫ অক্টোবর উন্নয়ন কমিটির বৈঠক, ১৬ অক্টোবর মূল বার্ষিক অধিবেশন এবং ১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও আর্থিক কমিটির পূর্ণাঙ্গ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।



