দুই মিনিটের নোটিশে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল

, চাকরি

দুই মিনিটের নোটিশে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা ছিল শনিবারের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। এদিন ১১তম গ্রেডের ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে অংশ নেওয়ার কথা ছিল প্রায় তিন লাখ চাকরিপ্রার্থীর। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর মাত্র দুই মিনিটের মাথায় ওএমআর শিট বিতরণ শেষ হওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কেন্দ্রজুড়ে পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দেন। সরকারি ছুটির দিনটিতে ঢাকামুখী পরীক্ষার্থীদের ভিড়ে রাজধানীর মেট্রোরেলসহ অন্যান্য গণপরিবহন ছিল কানায় কানায় পূর্ণ, যার বড় একটি অংশই এসেছিলেন দেশের দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে। সরকারি ছুটির দিন শনিবার সকাল থেকেই রাজধানীর মেট্রোরেল স্টেশনগুলোয় ছিল বাড়তি ভিড়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আগারগাঁও, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া স্টেশনে যাত্রীদের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। কারওয়ান বাজার মেট্রোরেলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের এক পরীক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সারা দেশ থেকে প্রায় তিন লাখ চাকরিপ্রার্থী ঢাকায় এসেছেন।

পরীক্ষাকেন্দ্রে ওএমআর শিট হাতে পাওয়ার পর এমন আকস্মিক ঘোষণায় হতবাক হয়ে যান শিক্ষার্থীরা। দূর থেকে ঢাকায় এসে থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতের পেছনে বড় অংকের ব্যয় বহন করতে হয়েছে তাঁদের। যশোরের এম এম কলেজ থেকে আসা ফরিয়া ফেরদৌসের মতো অনেক পরীক্ষার্থীই আক্ষেপ করে বলেছেন, কষ্ট করে কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর এমন সিদ্ধান্ত তাঁদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। এ অবস্থায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এভাবে শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা বাতিলের ফলে যে আর্থিক ক্ষতি হলো, তার দায়ভার কে নেবে? তিনি জানান, অনেক কষ্টে সকালে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন।

পরীক্ষা বাতিলের পরপরই রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাঁদের অভিযোগ, শুক্রবার রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুঞ্জন ও কিছু নমুনা ছড়িয়ে পড়েছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি তখনই যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে ঢোকানোর পর ওএমআর শিট বিতরণ করে পরীক্ষা বাতিল করায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসা পরীক্ষার্থীদের একাংশ সড়কে বিক্ষোভ করেন। ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়ক ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও মিরপুর এলাকায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভে ঘটনাও ঘটে।

এ বিষয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশাসন উইংয়ের পরিচালক ডি এম আতিকুর রহমান জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া প্রশ্নপত্রের সাথে মূল প্রশ্নের আংশিক মিল পাওয়া গেছে। আর এ কারণেই পরীক্ষা স্থগিতের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে পরীক্ষা বাতিলের কারণে সৃষ্ট আর্থিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাজহারুল হক জানিয়েছেন, দ্রুতই পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে। তবে এর বাইরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িতদের শনাক্তকরণ বা পরীক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা আসেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, প্রতিটি পদের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ২৪০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিল। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, যার ফলে সরকারি চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতায় প্রতিটি পরীক্ষার গুরুত্ব চাকরিপ্রার্থীদের কাছে অপরিসীম। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর এ ধরনের অনিশ্চয়তা তরুণদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

চাকরিপ্রার্থীরা এখন শুধু নতুন তারিখ ঘোষণা নয়, বরং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি জানাচ্ছেন। সেই সাথে দূর থেকে আসা ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ বা অন্য কোনো প্রতিকার নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তারা। পরীক্ষা অনুষ্ঠানের আগে প্রশ্নপত্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো অনিয়ম আঁচ করতে পারলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। পরীক্ষা না হওয়ায় সেই খরচও বিফলে যায়।

উল্লেখ্য, একই দিনে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসক ও কর্মচারী পদে ১০৮ জনের চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ার খবরসহ দেশের চাকরির বাজারে নানা ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার চিত্র উঠে এসেছে। এছাড়া সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ারের দিকেও নজর রাখছেন নতুন প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থীরা। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের এই ঘটনাটি সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।