জমি বা সম্পত্তি হেবা বা দান করার কর ও

, ব্যাংক

জমি বা সম্পত্তি হেবা বা দান করার কর ও

বাংলাদেশে পরিবার বা নিকটাত্মীয়দের মধ্যে জমি কিংবা অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি প্রচলিত আইনি পদ্ধতি হলো হেবা বা দান। তবে অনেকে ভুল করে মনে করেন যে, পারিবারিক সম্পত্তি দান করলে কোনো কর দিতে হয় না, আবার অনেকের ধারণা সব হেবার ওপরই কর প্রযোজ্য। বাস্তবে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দানকর ও আয়করের বিধানগুলো সম্পূর্ণ আলাদা এবং তা লেনদেনের প্রকৃত প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে।

দানকর আইন ১৯৯০-এর ধারা ২ অনুযায়ী, যখন কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও কোনো ধরনের বিনিময় বা প্রতিদান ছাড়াই অন্যকে নগদ অর্থ, জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মতো সম্পত্তি হস্তান্তর করেন, তাকে দান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী, ১ জুলাই ১৯৯০ থেকে প্রদত্ত সকল দানের ওপর দানকর প্রযোজ্য, যদি না আইনে নির্দিষ্ট কোনো অব্যাহতির বিধান থাকে। এটি মনে রাখা জরুরি যে, দানকর মূলত দাতার আর্থিক দায়, যা গ্রহীতার আয়কর থেকে স্বতন্ত্র একটি বিষয়। ফয়সাল ইসলাম, ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও আর্থিক খাত বিশ্লেষক।

আইনের ধারা ৪ অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে দানে কর ছাড় পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত সম্পত্তি, সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে দেওয়া দান, এবং সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, দুর্যোগ তহবিল বা দাতব্য সংস্থায় করা দান। এছাড়া নির্ভরশীল আত্মীয়ের বিবাহে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দান, নির্দিষ্ট বিমা পলিসি, উইল বা অসিয়ত এবং মৃত্যুশয্যাজনিত দানও করমুক্ত। বিশেষ করে পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা, স্বামী-স্ত্রী এবং আপন ভাই-বোনকে করা দানও এই ধারার আওতায় দানকরমুক্ত থাকে।

ব্যক্তিগতভাবে কোনো ব্যক্তি একটি অর্থবছরে সর্বমোট ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দান করলে তা দানকরমুক্ত রাখা হয়েছে। তবে এই সীমা প্রতিটি আলাদা দান বা দলিলের জন্য নয়, বরং ওই অর্থবছরে করা সমস্ত দানের সমষ্টির ওপর প্রযোজ্য। দাদা-নাতি, নানা-নাতনি কিংবা চাচা-ভাতিজার মতো সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ নেই; এসব ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন। দান করা সম্পত্তির বাজারমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ধারা ৫ অনুযায়ী, হস্তান্তরের তারিখে ওই সম্পত্তির সম্ভাব্য খোলাবাজার দর অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করতে হবে, দলিলে উল্লেখিত মূল্য সবসময় করযোগ্য হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে। অর্থাৎ কোনো দানের পুরো মূল্যের ওপর সরাসরি ২০ শতাংশ কর আরোপ করা যাবে না; বরং প্রতিটি ধাপের অংশের ওপর সংশ্লিষ্ট হার প্রয়োগ করতে হবে। তাই দানপত্রে কম মূল্য লেখা থাকলেই করের হিসাবেও সেই মূল্য গ্রহণ করতে হবে—এমন নয়।

দানকর আইনের তফসিলে করহারের ধাপ রয়েছে। মোট করযোগ্য দানের প্রথম ৫ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ, পরবর্তী ১০ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট অংশের ওপর ২০ শতাংশ হারে দানকর দিতে হয়। দানকারীকে পরবর্তী কর বছরের ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে উপ-কর কমিশনারের কাছে নির্ধারিত ফরমে রিটার্ন দাখিল করতে হয়। প্রয়োজনে উপ-কর কমিশনার নোটিশের মাধ্যমে রিটার্ন দাখিলের নির্দেশ দিতে পারেন, যেখানে কমপক্ষে ৩০ দিন সময় দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে প্রয়োজন বা যুক্তিসংগত কারণ থাকলে উপ–কর কমিশনার রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বৃদ্ধি করতে পারবেন।

আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৬৬ অনুযায়ী, যে কোনো প্রাপ্তি ‘অন্যান্য উৎস হতে আয়’ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই সম্পত্তি দান পেলেই তা গ্রহীতার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আয়করমুক্ত হয়ে যায় না। তবে ষষ্ঠ তফসিলের অংশ-১-এর দফা ৩৫ অনুযায়ী, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, মাতা-পিতা ও আপন ভাই-বোনের কাছ থেকে প্রাপ্ত দান আয়করমুক্ত থাকে, যদি উভয়ের রিটার্নে তার সঠিক প্রদর্শন থাকে। এক্ষেত্রে বিদেশে থাকা দাতা যদি ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠান, তবে তাঁর রিটার্নে তা দেখানোর বাধ্যবাধকতা নেই।

২০২৬ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে আয়কর আইন ২০২৩-এর ১২৫ নম্বর ধারায় (২ক) উপধারা যুক্ত করা হয়েছে, যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর। এই বিধান অনুযায়ী, হেবা বা দানের ক্ষেত্রে দানকর প্রযোজ্য হলে নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা এ-চালানের মাধ্যমে সেই কর সংগ্রহ করবেন। ফলে আলাদা করে উৎসে কর কাটার প্রয়োজন পড়বে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত ৭ জুলাইয়ের এক স্পষ্টীকরণে জানিয়েছে, এই নিয়মটি শুধু হেবা বা দানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নয়।

পরিশেষে, দলিলে ‘হেবা’ শব্দটি লিখলেই তা আয়কর বা দানকর থেকে মুক্তি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ ও মুসলিম আইনের আলোকে হেবার আইনি স্বীকৃতি থাকলেও, কর নির্ধারণে দলিলে ব্যবহৃত নামের চেয়ে লেনদেনের আর্থিক ও আইনগত চরিত্রই প্রধান বিবেচ্য। তাই জমি বা সম্পত্তি হস্তান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা ও অব্যাহতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে নেওয়া জরুরি।