রাজশাহী থেকে আব্দুলপুর জংশন পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার রেলপথ এখন যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে চরম ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো এই লাইনটি ১৯৬২ সালে সর্বশেষ বড় ধরনের সংস্কারের পর আর কোনো স্থায়ী উন্নয়নের মুখ দেখেনি। ফলে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অবকাঠামোগত জরাজীর্ণতায় ভুগছে গুরুত্বপূর্ণ এই রেলপথটি। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রকৌশল কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাইনটির প্রায় ৩৫ কিলোমিটার অংশ বর্তমানে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পশ্চিমাঞ্চল রেলের প্রকৌশল কর্মকর্তারাও প্রায় ৩৫ কিলোমিটার অংশের নাজুক অবস্থার কথা জানিয়েছেন। তারা জানান, এ রেলপথে বড় ধরনের সংস্কার হয়েছিল ১৯৬২ সালে। পুরোনো রেলপথের দুর্বলতা এখন আর কেবল যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয় নয়, এটি নিরাপত্তার বিষয়েও পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি ডুয়েলগেজ চালুর দাবিও দীর্ঘদিনের। ৪৫ কিলোমিটারের এই রেলপথ তাই রাজশাহীর কাছে শুধু একটি যোগাযোগ পথই নয়; উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। শুধু যাত্রী নয়, বিপাকে কৃষক-ব্যবসায়ী।
লাইনটি ব্যবহারের উপযোগী না থাকায় ট্রেনের স্বাভাবিক গতি ঘণ্টায় ৯৫ কিলোমিটার থেকে কমিয়ে ৪০ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহু জায়গায় কাঠের স্লিপার পচে নষ্ট হয়ে গেছে, লাইনের ক্লিপ ও সংযোগ উপকরণগুলো ঢিলেঢালা হয়ে পড়েছে এবং প্রয়োজনীয় পাথরের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। রেললাইনের বিভিন্ন স্থানে মরিচা ধরায় তীব্র গরম বা শীতে লাইন ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এমনকি মাঝেমধ্যে লাইন ভেঙে বা ফাটল ধরে ট্রেন চলাচলে বিপত্তি ঘটছে। একটি ট্রেন সামান্য দেরি করলেই তার প্রভাব পড়ে পরবর্তী ট্রেনের ওপর।
দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায়ই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক সংকেত দিচ্ছেন।
অতীতে পঞ্চগড়গামী বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস, সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস, কমিউটার এক্সপ্রেস, বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনগুলো স্থানীয়দের লাল গামছা বা কাপড় দেখানোর কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে। কোথাও আবার ভাঙা লাইন দেখে স্থানীয়দের লাল গামছা উড়িয়ে থামাতে হয়েছে ছুটে চলা ট্রেন। এই রেলপথে একাধিকবার বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হলেও শেষ মুহূর্তে স্থানীয়দের সতর্কতায় থেমেছে ট্রেন। ২০২৫ সালে পঞ্চগড়গামী বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস সরদহ রোড স্টেশন পার হওয়ার পর স্থানীয়রা রেললাইনের প্রায় দুই ফুট অংশ ভাঙা দেখতে পান। স্থানীয়দের দাবি, এতে সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা থেকে প্রায় ৭০০ যাত্রী রক্ষা পান। পরে লাল কাপড় ও আলো দেখিয়ে খুলনা থেকে আসা সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস থামানো হয়। ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন হলেও বার্তাটি স্পষ্ট।
এসব ঘটনায় কয়েকশ যাত্রী সম্ভাব্য প্রাণহানি থেকে বেঁচে যান।
স্থানীয়রা বলছেন, রেলের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার চেয়ে বর্তমানে তাদের সতর্কতাই ট্রেন চলাচলে প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহী-আব্দুলপুর অংশটি সিঙ্গেল ব্রডগেজ হওয়ায় ট্রেন চলাচলে প্রচুর সময় নষ্ট হচ্ছে। বিপরীতমুখী ট্রেনকে সিগন্যালের জন্য স্টেশনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, যার ফলে প্রতিটি ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটছে। পাকশী বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা হাসিনা খাতুন জানান, এই রুটে ১৩ জোড়া আন্তঃনগর, চার জোড়া মেইল ও তিন জোড়া লোকাল ট্রেন নিয়মিত চলাচল করে। এত ব্যস্ত একটি রুটে জরাজীর্ণ লাইনের কারণে ঝুঁকি ও সময়ক্ষেপণ উভয়ই চরমে পৌঁছেছে। ফলে একই সময় দুদিকের ট্রেন চলতে পারে না। ফলে বাড়ে যাত্রার সময়, কমে একই রেক ও লোকোমোটিভের দিনে ট্রিপ পরিচালনার সুযোগ।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও রেলপথের এই বেহাল দশা রাজশাহীর জন্য বড় সংকটের কারণ। রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক শাকিলুর রহমান জানান, কৃষিপ্রধান অঞ্চল হওয়ায় এখান থেকে প্রচুর পণ্য সারা দেশে পাঠানো হয়। কিন্তু রেলপথের সক্ষমতা কম থাকায় ব্যবসায়ীরা সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ওয়াগনের অভাব থাকায় পচনশীল পণ্য পরিবহনেও ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। এর প্রভাব পড়ছে রাজশাহীর কৃষিপণ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও। পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় পরিবহনে মান ও বাজারদরেও প্রভাব পড়ে থাকে।
রেলওয়ের আয়-ব্যয়ের তথ্যেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১,১৬০ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে মাত্র ৬২১ কোটি টাকা। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১,০৭৭ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় ছিল ৬৪৯ কোটি টাকা। এছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ৮২৫ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে ৫৬৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সংস্কারের অভাবে রেলওয়ে তার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পাকশী বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ নাজিব কায়সার ও সহকারী প্রকৌশলী বাবুল হোসেনের মতে, লাইনটির আয়ুষ্কাল ৫০ বছর পার হয়ে গেছে এবং বর্তমানে নতুন করে লাইন স্থাপন ছাড়া বিকল্প নেই। আপাতত মেরামতের মাধ্যমে ট্রেন সচল রাখা হলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। রেলপথটি ডাবল লাইনে উন্নীত করা এবং ডুয়েলগেজ ব্যবস্থা চালু করা সময়ের দাবি। একইসঙ্গে পণ্য পরিবহনের জন্য আধুনিক ও রেফ্রিজারেটেড ওয়াগন যুক্ত করা হলে এটি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।



