ইনানীতে হোটেল ভাঙচুর ও আইনি জটিলতায় পর্যটন খাতে উদ্বেগ

, বাংলাদেশ

ইনানীতে হোটেল ভাঙচুর ও আইনি জটিলতায় পর্যটন খাতে উদ্বেগ

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের পর্যটন অবকাঠামোর অনিয়ম দূর করতে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) সাম্প্রতিক কঠোর পদক্ষেপে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই তৎপরতা কতটা পরিকল্পিত বা সমন্বিত আর কতটুকু পরিকল্পিত বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। পুরোনো অনুমোদন বনাম নতুন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার।

সর্বশেষ ইনানী এলাকার ‘বে হিলটন বিচ রিসোর্ট’-এর মালিক শহীদুল হকের দাবি অনুযায়ী, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বৈধ অনুমোদনের ভিত্তিতেই তিনি সেখানে প্রায় ছয় কোটি টাকা বিনিয়োগ করে চারতলা হোটেলটি নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পর কউক হঠাৎ ভবনটিকে ‘সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এবং শুনানির নির্ধারিত তারিখের আগেই সোমবার সকালে ভাঙচুর চালায়। তিনি আরও দাবি করেন, কোনো কাগজপত্রের তোয়াক্কা না করে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সোমবার সকালে ৬ কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে তোলা চারতলা নির্মাণাধীন হোটেলটি ভাঙচুর করেছে। ফলে দীর্ঘদিন পর ওই অনুমোদনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার উদ্যোগ আইনগতভাবে কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে তিনি আপত্তি জানিয়েছেন। এসব স্থাপনার অনেকগুলোই স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের মধ্যেই নির্মিত হয়েছে।

শহীদুল হকের লিখিত দাবি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জমির মূল মালিক ছিলেন জাকির হোসেন। বে হিলটন বিচ রিসোর্টের মালিক শহীদুল হক কউকের চেয়ারম্যানের কাছে গত ২৬ অক্টোবর দেওয়া এক লিখিত জবাবে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট জমির মূল মালিক ছিলেন জাকির হোসেন।

পরবর্তীতে ২০০১ সালের ৪ এপ্রিল নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে কহিনুর শওকত জমিটির মালিকানা পান এবং তাঁর নামে নামজারি খতিয়ান সম্পন্ন হয়। পরে তাঁর নামে পৃথক নামজারি খতিয়ানও সৃজন করা হয়।

২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারি জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এই ভবনের নকশা অনুমোদন ও ৩১ ডিসেম্বর নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট ১৫৩২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তিনি জমি ও ভবনটি কিনে নিয়ে নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করে আসছেন। এতে ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর নকশা প্রদর্শনের নোটিশ, ১৯ নভেম্বর কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং ৭ ডিসেম্বর চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

বিনিয়োগকারীর দাবি, কউকের নির্দেশ মেনেই তিনি অনুমোদিত নকশা জমা দিয়েছিলেন। এমনকি জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদ ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি নকশার সত্যতা নিশ্চিত করেছিল এবং পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ১ জুলাই অনাপত্তি সনদও নেওয়া হয়েছিল। তবে কউকের বক্তব্য ভিন্ন; তাদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদের নকশা বা পরিবেশগত সনদ থাকলেই জাতীয় ভবন নির্মাণবিধি (বিএনবিসি) অনুসরণ নিশ্চিত হয় না।

কউকের ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিশে দাবি করা হয়, ভবনটি ২০১৮ সালের আগে শুরু হয়নি, তাই বিএনবিসি ২০২০ অনুযায়ী কউকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক ছিল। এছাড়া ১২ আগস্ট কউক সদস্য (প্রকৌশল)-এর নেতৃত্বাধীন দল পরিদর্শনে ভবনে কাঠামোগত ত্রুটি খুঁজে পাওয়ার দাবি করে। এ কারণে ভবনটিকে কেন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হবে না, তার ব্যাখ্যাসহ কারিগরি মূল্যায়ন রিপোর্ট চাওয়া হয়েছিল। ভবনটির নিরাপত্তা যাচাইয়ে কারিগরি ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় নথিও চেয়েছে সংস্থাটি। নোটিশে বলা হয়, ভবনটির নির্মাণকাজ ২০১৮ সালের আগে শুরু হয়নি বলে সরেজমিন তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। পরিদর্শনে ভবনের বিভিন্ন অংশে দৃশ্যমান কাঠামোগত ত্রুটি, বিচ্যুতি ও অন্যান্য অসংগতি পাওয়া গেছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়। ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হবে না কেন, সে বিষয়ে ১৪ দিনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কারিগরি ব্যাখ্যা, কাঠামোগত বিশ্লেষণ বা মূল্যায়ন প্রতিবেদন, প্রত্যয়নপত্র এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শহীদুল হকের আইনি যুক্তি হলো, ভবন নির্মাণের সময় ওই এলাকা কউকের আওতাভুক্ত ছিল না, তাই ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতিই ছিল আইনি ভিত্তি। তবে কউক তাদের নোটিশে স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবরের একটি চিঠির উল্লেখ করে জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের দেওয়া ওই অনুমোদন ও ব্যবহার সনদ বিধিবহির্ভূত ছিল।

এদিকে পর্যটন খাতের বিনিয়োগকারীরা বলছেন, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় পাঁচ শতাধিক রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, যার অনেকের ক্ষেত্রেই একই ধরনের আইনি পরিস্থিতি বিদ্যমান। একটি দুর্ঘটনায় (পাটুয়ারটেকে টুংটুং রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু) ঘটনার পর সব স্থাপনার ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে প্রতিটি ভবনের ঝুঁকি, আইনগত অবস্থান ও বাস্তবতা অনুযায়ী আলাদাভাবে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অনিয়ম থাকলে সমাধান চান বিনিয়োগকারীরা। এ ধরনের দুর্ঘটনা হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তা, ভবনের কাঠামোগত স্থায়িত্ব, জরুরি নির্গমনপথ এবং অনুমোদনসংক্রান্ত শর্ত কঠোরভাবে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

বিনিয়োগকারীদের একাংশের আশঙ্কা, যথাযথ যাচাই-বাছাই ও শুনানির সুযোগ না দিয়ে এ ধরনের ভাঙচুর নতুন বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করবে। বিশেষ করে শহীদুল হকের মালিকানাধীন ভবনটির ক্ষেত্রে আগামী ২৮ অক্টোবর শুনানির তারিখ থাকা সত্ত্বেও ভাঙচুর চালানোর ঘটনাটি বেশ রহস্যজনক বলে বিবেচিত হচ্ছে।

এই ইস্যুতে কউকের অথরাইজড কর্মকর্তা ফজলে রাব্বির বিরুদ্ধে একটি পক্ষের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে, যা সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। শহীদুল হক বরাবরই দাবি করে আসছেন যে, ভবনটি মাস্টারপ্ল্যানের পরিপন্থি প্রমাণিত হলে তিনি সংস্কার করতে প্রস্তুত এবং নিরপেক্ষ প্রকৌশলী দিয়ে পুনরায় পরীক্ষা করানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।

পর্যটন শিল্পের টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এখন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, বিনিয়োগকারীদের আইনগত সুরক্ষা এবং কাঠামোগত নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল নিয়মবহির্ভূত বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত নয়, বরং আইন মেনে বিনিয়োগ করা উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের টেকসই উন্নয়নে নিরাপদ অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও বিনিয়োগবান্ধব প্রশাসনিক পরিবেশ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখাও কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ি এমএইচ।