মাঠের ভেতর প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে আতঙ্ক ছড়ানোর পাশাপাশি মাঠের বাইরেও হ্যারি কেইন সমানভাবে দক্ষ। ৩৩ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার এখন নিজের ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করছেন। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে মাঠের পারফরম্যান্স আর ব্যবসার জগতের বিচক্ষণতা—দুই ভুবনেই তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। টটেনহামে থাকতে এই অপবাদ কিছুতেই ঘোচাতে পারেননি। ইংল্যান্ডের হয়ে তিনবার প্রিমিয়ার লিগের গোল্ডেন বুট জেতা কেইন ব্যবসার প্রথম বড় সাফল্য পেয়েছেন আবাসন খাতে। বয়স ৩৩ হলেও জার্মান চ্যাম্পিয়নরা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে চায় ইংল্যান্ড অধিনায়ককে। পরিচিতি ‘দ্য হ্যারি কেইন কোম্পানি’ নামে। উদ্দেশ্য, কেইনের পরিচিতি কাজে লাগিয়ে অন্যদের অনুপ্রাণিত করা, শিক্ষা দেওয়া এবং ক্ষমতায়ন করা। এমন পরিকল্পনা অবশ্য রাতারাতি করেননি কেইন।
২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ের মাধ্যমে কেইন দীর্ঘ ২৫ বছর পর প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই ব্যক্তিগত পুরস্কারটি জেতার গৌরব অর্জন করেছেন। সর্বশেষ সংযোজন ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর। মেসি এবার ব্যালন ডি’অরে পঞ্চম, অন্যরা কে কত নম্বরে।
কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালকে পেছনে ফেলে সেরার মুকুট পরেছেন তিনি।
২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে সব প্রতিযোগিতায় ৭৩ গোল করে বায়ার্ন মিউনিখকে টানা দ্বিতীয় বুন্দেসলিগা শিরোপা ও ঘরোয়া ট্রেবল জেতাতে মূল ভূমিকা রেখেছেন। সেই সঙ্গে তিনি জিতে নিয়েছেন বর্ষসেরা স্ট্রাইকারের স্বীকৃতিও। গোল করেন, গোল্ডেন বুট জেতেন, কিন্তু ট্রফি জেতেন না। টটেনহামের মূল দলে জায়গা করে নেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরের ঘটনা।
তবে ফুটবলীয় সাফল্যের সমান্তরালেই গড়ে উঠেছে কেইনের বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। মাত্র ২১ বছর বয়সে, ২০১৪ সালের অক্টোবরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘এইচকে২৮ লিমিটেড’। এটি মূলত তাঁর ফুটবল, ব্যবসা, বিনোদন ও দাতব্য কার্যক্রম পরিচালনার প্রধান মাধ্যম। লিংকডইন পেজের তথ্যানুযায়ী, ইংল্যান্ড অধিনায়কের সমস্ত বাণিজ্যিক স্বার্থ এখান থেকেই পরিচালিত হয়, যেখানে তিনি বাইরের এজেন্সির ওপর নির্ভর না করে নিজেই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ রাখেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২১। কেইনের দলবদল থেকে শুরু করে বড় অঙ্কের চুক্তি, সবকিছু সামলান। তবে শুধু পরিবারের মধ্যেই ব্যবসা সীমাবদ্ধ রাখেননি কেইন।
আবাসন খাতের বিনিয়োগেও বেশ সফল কেইন। বাবা, মা ও ভাই চার্লির সঙ্গে মিলে তিনি ‘এডওয়ার্ড জেমস ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড’ নামের একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। যেখানে তাদের সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি পাউন্ড। এছাড়া চেলসির কিংবদন্তি জন টেরির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ করেছেন ‘সিট ইউনিক’ নামের একটি টিকিট ব্যবস্থাপনা ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানে, যার বাজারমূল্য ৫০ কোটি পাউন্ডের বেশি। ভাইয়ের উপার্জিত অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করলে আরও বাড়বে, সেটাও দেখেন চার্লি। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ইভেন্টের টিকিট বিক্রি এবং ব্যবস্থাপনার কাজ করে।
বাণিজ্যিক চুক্তির ক্ষেত্রেও কেইন অত্যন্ত কৌশলী। অ্যামাজন, ক্যাডবেরি ও টপসের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে তাঁর চুক্তি রয়েছে। বাভারিয়ার স্থানীয় বাজার ধরতে তিনি চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন জার্মান ওটস ব্র্যান্ড থ্রিবিয়ার্সের সঙ্গে। এছাড়া স্ট্যাটস্পোর্টস ও বায়োঅ্যান্ডমির মতো স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত আছেন তিনি।
সবচেয়ে চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত ছিল প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড ছেড়ে স্কেচার্সের সঙ্গে আজীবনের বুট চুক্তি স্বাক্ষর করা। এই চুক্তি থেকে তিনি বছরে প্রায় ৮০ লাখ পাউন্ড আয় করেন। বায়ার্ন মিউনিখে তাঁর সাপ্তাহিক বেতন প্রায় ৪ লাখ পাউন্ড, যা বছরে ২ কোটি ৮ লাখ পাউন্ডের সমান। বর্তমান পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বায়ার্ন মিউনিখ তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কেইনকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে এবং তাঁর সঙ্গে নতুন চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। একসময় তাঁকে নিয়ে একটা রসিকতা চালু ছিল। শেষ পর্যন্ত উত্তর লন্ডনের মায়া ছেড়ে চলে গেলেন জার্মানির মিউনিখে। তারপর যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে গেলেন।
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই সুপরিকল্পিতভাবে এগোতে পছন্দ করা কেইন জানেন যে পেশাদার ফুটবল খুব বেশি দীর্ঘ হয় না। তাই মাঠে বল জালে জড়ানোর পাশাপাশি মাঠের বাইরের এই আর্থিক ভিত্তি তাঁকে অন্য উচ্চতায় বসিয়েছে। মাঠ ও মাঠের বাইরে সমান আধিপত্য বজায় রেখে হ্যারি কেইন এখন বিশ্বজুড়ে ফুটবলারদের জন্য এক নতুন অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছেন। আর মাঠের বাইরে টাকা বানানোর জন্য আছে মাথা। নাম শুনে মনে হতে পারে, কোনো ফুটবল একাডেমি। তবে এসব চুক্তির কোনোটিই তাঁর ফুটবল বুটের চুক্তির কাছে দাঁড়াতে পারে না।



