শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লিতে দুই দিনব্যাপী ২৯তম ফাতেমা রানীর তীর্থোৎসব শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেল চারটায় পবিত্র খ্রিষ্টযাগের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এই ধর্মীয় আয়োজনে অংশ নিতে দেশ-বিদেশের প্রায় ৫০ হাজার পুণ্যার্থী সমবেত হয়েছেন, যা এলাকাটিকে একটি সম্প্রীতির মিলনমেলায় পরিণত করেছে। এবারের তীর্থোৎসবের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মানবতার জননী: ফাতেমা রানী মা মারিয়া’।” ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের মানুষের উপস্থিতিতে তীর্থস্থানটি পরিণত হয়েছে সম্প্রীতির মিলনমেলায়। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের সম্মিলিত প্রার্থনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তীর্থের গাম্ভীর্য ফুটে ওঠে।
উৎসবের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে মোমবাতি প্রজ্বালন করে একটি আলোক শোভাযাত্রা বের করা হয়। তাঁদের অধিকাংশের হাতে জ্বলছে মোমবাতি। পরে রাতে আলোক শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে জ্বলতে থাকা মোমবাতির মৃদু আলোয় তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। বছর ঘুরে এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি জনপদে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।
প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পুণ্যার্থীরা মা মারিয়ার সুউচ্চ মূর্তির পাদদেশে জড়ো হন। সেখানে বিকাশ প্যান্ডেলের নিচে অনুষ্ঠিত হয় সম্মিলিত প্রার্থনা। রাত ১১টার দিকে আরাধ্য সাক্রামেন্টের আরাধনা এবং মধ্যরাতে নিরাময় অনুষ্ঠান ও নিশি জাগরণের মাধ্যমে প্রথম দিনের ধর্মীয় কার্যক্রম শেষ হয়। আজ শুক্রবার সকাল আটটায় জীবন্ত ক্রুশের পথ এবং সকাল ১০টায় মহাখ্রিষ্টযাগের মাধ্যমে দুই দিনের এই আয়োজনের সমাপ্তি ঘটবে। নতুন দিনের সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করে সবাই হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যান।’।
বারোমারী খ্রিষ্টান মিশনের ফাদার তরুণ বনোয়ারী জানান, প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এই তীর্থোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। পুণ্যার্থীরা মা মারিয়ার কাছে পাপ স্বীকার এবং নিজের পরিবার, দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করেন। ক্লোডিয়া নকরেক নামের এক পুণ্যার্থী জানান, পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করা তীর্থযাত্রীদের এক অনন্য আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা, যা তাদের নতুন সুখ-সমৃদ্ধির আশা যোগায়। কেউ এসেছেন পাপ স্বীকার করে মুক্তি লাভের আশায়, কেউ প্রিয়জনের রোগমুক্তি কামনায়।
উল্লেখ্য, ১৯৪২ সালে ৪২ একর জমির ওপর এই ধর্মপল্লিটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৮ সালে একে বার্ষিক তীর্থস্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে গড়ে তোলা এই স্থানে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষ ভিড় করেন। এ বছর আয়োজকদের মতে ভক্তদের সমাগম অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশ আশাব্যঞ্জক। অন্য বছরের তুলনায় এবার ভক্তদের সমাগম বেশি হয়েছে।
উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শেরপুরের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন জানান, এক সপ্তাহ ধরে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষে উৎসবটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার জন্য জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর ৪০০-এর বেশি সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।” উৎসব ঘিরে নেওয়া হয়েছে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা।



