কমিউনিটি পুলিশিং: জনআস্থা বাড়াতে সংস্কার ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

, বাংলাদেশ

কমিউনিটি পুলিশিং: জনআস্থা বাড়াতে সংস্কার ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’—এই প্রচলিত ধারণার উৎস ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া কঠিন। ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’—এই কথাটি কে, কখন, কোন প্রেক্ষাপটে প্রথম বলেছিলেন, তার নির্ভরযোগ্য সূত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন। হোলি আর্টিজানে প্রাণ দেওয়া পুলিশ সদস্যদের কি আমরা ভুলে যাচ্ছি। পুলিশ বাহিনীর ভেতরের বৈষম্যের অবসান হবে কবে। পুলিশ কি ক্ষমতাসীনদের লাঠিয়াল হয়েই থাকবে।

তবে আধুনিক ও কার্যকর পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে এই দর্শনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের ভূমিকা অপরিহার্য। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অপরাধ প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, জননিরাপত্তা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এর গুরুত্ব অপরিসীম।

কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এটি স্পষ্ট যে, কেবল পুলিশের একক প্রচেষ্টায় অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তবে কথাটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য স্পষ্ট।

এর জন্য প্রয়োজন পুলিশ ও জনগণের পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা এবং অংশীদারত্ব। এই সমন্বিত ব্যবস্থাই হলো কমিউনিটি পুলিশিং। এটি কোনো বিকল্প বা অনানুষ্ঠানিক পুলিশি ব্যবস্থা নয়, বরং পেশাদার পুলিশিংকে অধিকতর জনবান্ধব, তথ্যসমৃদ্ধ এবং জবাবদিহিমূলক করার একটি কার্যকর পদ্ধতি। চুরি-ছিনতাই কমাতে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা জরুরি। পুলিশিং আর ‘মোরাল পুলিশিং’ কেন একসঙ্গে চলতে পারে না। পুলিশি সেবায় বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্বের ধারণা জন–আস্থা তৈরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জুলাইয়ের দুই বছর: পুলিশ সংস্কার কেন অগ্রাধিকার হয়ে উঠল না।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের দর্শনের আইনি ভিত্তির দিকে তাকালে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর কিছু বিধানের প্রসঙ্গ সামনে আসে। এই আইনের ৪২ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ কর্মকর্তাকে আইনসম্মত সহায়তা করার কথা বলা হয়েছে এবং ৪৪ ধারায় বিশেষ অপরাধের তথ্য কর্তৃপক্ষকে জানানোর বিধান রয়েছে। তবে আইনগতভাবে এই কমিটি বা স্বেচ্ছাসেবকদের কাউকে গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা শাস্তি দেওয়ার কোনো স্বতন্ত্র ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি। এ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা যায়।

বাংলাদেশে বর্তমানে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কার্যকারিতা বৃদ্ধির পথে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের অভাব অন্যতম। অনেক ক্ষেত্রে কমিটি গঠনে স্থানীয় মানুষের মতামতের চেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আধিপত্য বেশি লক্ষ্য করা যায়। এতে নারী, তরুণ, সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব ও জবাবদিহির সংকট এই উদ্যোগকে স্থবির করে রেখেছে। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কার্যকারিতা মূল্যায়নের নির্দিষ্ট সূচক না থাকায় এর সাফল্য বা ব্যর্থতা নিরূপণ করাও কঠিন। একইভাবে স্থানীয় কমিটিগুলোকে শুধু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পুলিশের সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়ে জনমানুষের প্রত্যাশা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। এই পটভূমিতে কেবল সভা-সেমিনারে কমিউনিটি পুলিশিং সীমাবদ্ধ রাখলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। পুলিশকে তার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। অপরাধের তথ্য পাওয়ার সহজ ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। বিশেষ করে শিশু, পারিবারিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তি, মানব পাচারের ভুক্তভোগী এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর গোপনীয়তা রক্ষা করা পুলিশের বড় দায়িত্ব। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কে জনগণের ধারণায় যে নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, তা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। একই সঙ্গে পুলিশকে গুজব, ব্যক্তিগত বিরোধ এবং যাচাইহীন অভিযোগ থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য আলাদা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। কোনো এলাকায় বারবার চুরি হলে সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করা, পর্যাপ্ত সড়কবাতির ব্যবস্থা করা, স্কুলপথ নিরাপদ করা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিকল্পিত টহল বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

কার্যকর পুলিশিংয়ের জন্য থানা ও বিট পর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে ‘কমিউনিটি সেফটি প্ল্যান’ বা নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। এই পরিকল্পনায় পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন: স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিয়মিত মাসিক সভা, আলোচিত সমস্যার সমাধান, স্থানীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সেগুলোর কার্যকর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ। শুধু অভিযানের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং অপরাধের হার হ্রাস এবং ভুক্তভোগীদের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে এই কার্যক্রমের মূল্যায়ন করতে হবে। কুড়িগ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়ান। আবার সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব, জনগণের মতামত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের দুর্বল ব্যবস্থা এবং কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার অভাবও রয়েছে। এসব আলোচনায় স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সমাধান নির্ধারণ করতে হবে। এতে পাঁচটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন: প্রথমত, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক যোগাযোগব্যবস্থা; দ্বিতীয়ত, মাসিক সভা এবং আলোচিত সমস্যা ও গৃহীত পদক্ষেপের লিখিত নথি; তৃতীয়ত, অপরাধ ও নিরাপত্তাঝুঁকির তথ্য দেওয়ার গোপনীয় ব্যবস্থা; চতুর্থত, স্থানীয় সরকার।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকার সীমাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া জরুরি। তারা স্থানীয় তথ্য সরবরাহ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারেন, কিন্তু পুলিশি ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করা বেআইনি। স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে অর্থ আদায়, তদন্তে হস্তক্ষেপ, প্রমাণ নষ্ট করা কিংবা সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করা কঠোরভাবে নিষেধ। কোনোভাবেই আইন প্রয়োগের দায়িত্ব অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।

ঢাকার মতো মহানগরে ট্রাফিক পুলিশ, ওয়ার্ড প্রতিনিধি, পরিবহন শ্রমিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কমিউনিটি পুলিশিং পরিচালনা করলে অবৈধ পার্কিং, যানজট এবং স্কুল এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হয়। অপরাধ প্রতিরোধের পরিকল্পনা গ্রহণের সময় কেবল গ্রেপ্তার নয়, বরং অপরাধের ধরন, স্থান ও কারণ বিশ্লেষণ করে টেকসই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। গুরুতর অপরাধের তদন্ত সবসময় আইনানুগ আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় হতে হবে এবং এখানে পেশাগত স্বাধীনতা অটুট রাখতে হবে। অপরাধসংক্রান্ত তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় অনেকে তথ্য দিতে ভয় পান। তিশা–মুশতাক বিতর্ক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নীতি পুলিশিং।

পরিশেষে, জনসম্পৃক্ততাই হলো কার্যকর পুলিশিংয়ের মূল চালিকাশক্তি। পুলিশ যখন নিরপেক্ষভাবে জনগণের কথা শোনে এবং স্বচ্ছতার সাথে দায়িত্ব পালন করে, তখনই পুলিশ ও জনগণের মধ্যে প্রকৃত আস্থা তৈরি হয়। এই আস্থাই একটি অপরাধমুক্ত নিরাপদ সমাজ গড়ার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে থানা পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।