সাফের ২৩ বছর: বাংলাদেশের সেই স্বপ্নের শিরোপা কি ফিরবে?

, খেলা

সাফের ২৩ বছর: বাংলাদেশের সেই স্বপ্নের শিরোপা কি ফিরবে?

২০০৩ সালের সেই রাতটি ছিল বাংলাদেশের কোটি ফুটবলপ্রেমীর স্বপ্ন পূরণের মুহূর্ত। ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে মালদ্বীপের বিপক্ষে ১-১ ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলের জয় তুলে নিয়ে লাল-সবুজের দল প্রথমবারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। মোহাম্মদ সুজনের শেষ শটটি জালে জড়ানোর সাথে সাথেই স্টেডিয়ামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের ঢেউ। সেই থেকে পেরিয়ে গেছে ২৩ বছর, কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের সেই শ্রেষ্ঠত্বের অধ্যায় আজও অধরা রয়ে গেছে। ২০০৩ সালের সেই রাত ছিল একটি জাতির স্বপ্নপূরণের রাত। ২৩ বছর পরও তাঁর চোখে সেই রাতের ছবি স্পষ্ট।

সেই ঐতিহাসিক দলের সদস্য ফরোয়ার্ড আলফাজ আহমেদের কাছে আজও সেই রাতের স্মৃতি সতেজ। তিনি বলেন, ২০০৩ সালের দলটির মূল ভিত্তি ছিল অটুট একতা এবং আত্মবিশ্বাস। কাউকে ভয় না পেয়ে নিজেদের দিনে যেকোনো প্রতিপক্ষকে হারানোর সাহস ছিল তাদের। তার মতে, আজকের প্রজন্মের খেলোয়াড়দের মধ্যেও প্রতিভা রয়েছে, শুধু প্রয়োজন সেই হারানো বিশ্বাস ও দৃঢ়তা পুনরুদ্ধার করা। মিডফিল্ডার মতিউর রহমান মুন্নাও মনে করেন, সুযোগ-সুবিধা অনেক বাড়লেও জাতীয় দলের জার্সির প্রতি আবেগ এবং কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প নেই। তিনি চান, নতুন প্রজন্ম আবার সেই আনন্দের মুহূর্ত ফিরিয়ে আনুক। আলফাজের কথায়, ‘২০০৩ সালের দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল একতা আর আত্মবিশ্বাস। আমরা যারা ২০০৩ সালে জিতেছিলাম, চাই নতুন প্রজন্ম আমাদের সেই আনন্দটা আবার দেখাক।’।

বাংলাদেশের সাফ যাত্রার শুরুটা ছিল ১৯৯৫ সালের সেমিফাইনাল দিয়ে। এরপর ১৯৯৭ সালে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়। তবে ১৯৯৯ সালের আসরে বাংলাদেশ আবারও ফাইনালে ওঠে, কিন্তু মালদ্বীপের কাছে ২-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়। চার বছর পর ২০০৩ সালে সেই অপূর্ণতা ঘুচিয়ে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর ২০০৫ সালেও ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ, কিন্তু করাচিতে ভারতের কাছে ২-০ ব্যবধানে হেরে রানার্সআপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ উঠেছিল শিরোপার মঞ্চে।

পরবর্তী সময়গুলোতে বাংলাদেশ ফুটবলের সাফল্যের গ্রাফ নিচে নামতে থাকে। ২০০৮, ২০১১, ২০১৩, ২০১৫ এবং ২০২১ সালে গ্রুপ পর্বেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের যাত্রা। ২০০৯ ও ২০১৮ সালে সেমিফাইনালে উঠলেও ফাইনালে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ আবারও সেমিফাইনালে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত তৃতীয় হয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করে। এই দীর্ঘ সময়ে ভারত ও মালদ্বীপ একাধিকবার শিরোপা জিতেছে, এমনকি আফগানিস্তান ২০১৩ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নতুন শক্তির জানান দিয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে সাফল্যের আলো ফিকে হয়েছে। আফগানিস্তান ২০১৩-তে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেখিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে নতুন শক্তিও উঠে আসতে পারে।

রোকনুজ্জামান কাঞ্চনের মতে, জাতীয় দলের জার্সির ওজন অনেক বেশি। খেলোয়াড়দের মনে রাখতে হবে তারা শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং পুরো দেশের প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নামে। বর্তমানে ফুটবলের এই কঠিন সময়ে দেশের ফুটবল কাঠামো নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা ও একাডেমি এবং লিগ পর্যায়ে সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া কেবল কোচ বা প্রবাসী ফুটবলারের ওপর নির্ভর করে আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা শুধু একটা ম্যাচ জেতার জন্য খেলিনি।

সম্প্রতি বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দলের সাফ শিরোপা জয় সিনিয়র দলের জন্য নতুন আশা জাগিয়েছে। ফাইনালে ভারতকে টাইব্রেকারে হারানো সেই সাফল্য প্রমাণ করে যে ভারতকে হারানো সম্ভব। কোচ ডুলির মতে, লক্ষ্য আরও উঁচুতে রাখতে হবে। তিনি বাংলাদেশের ফিফা র‍্যাঙ্কিং ১৫০-এর ঘরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন, যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শিশুরা শুধুমাত্র আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের সমর্থক না হয়ে, তাদের বিপক্ষে খেলার স্বপ্ন দেখতে পারে। ভারতকে হারানো যায়, শিরোপাও জেতা যায়।

ঘরের মাঠে যখনই বাংলাদেশ নামে, গ্যালারিতে তখন ২০০৩-এর জয় আর পরবর্তী বছরের ব্যর্থতার স্মৃতি হাতছানি দেয়। ১৯৯৯-এর হার, ২০০৫-এর ফাইনাল কিংবা ২০০৯ ও ২০১৮-এর সেমিফাইনালে আটকে যাওয়া—সবই বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের অংশ। কিন্তু নতুন প্রজন্ম অতীতের গল্প শুনে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না, তারা চায় নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হতে। তেইশ বছর আগের সেই সোনালী ট্রফি কি আবার ঢাকায় ফিরবে? সেই উত্তরের অপেক্ষায় এখন পুরো ফুটবল বিশ্ব।