ইনভেস্ট বাংলাদেশ: প্রতিশ্রুতি থেকে উৎপাদনে পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

, বাংলাদেশ

ইনভেস্ট বাংলাদেশ: প্রতিশ্রুতি থেকে উৎপাদনে পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রধান বাধা কখনোই শুধু সম্ভাবনার অভাব ছিল না। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বিশাল বাজার, প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তি, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ার কারণে দেশটির বিনিয়োগ সম্ভাবনা বহু আগে থেকেই স্বীকৃত। দ্রুত বিকাশমান ভোক্তাশ্রেণিও বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় আকর্ষণ। কিন্তু এই সম্ভাবনা এবং প্রকৃত বিনিয়োগের মধ্যে যে দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে, সেখানেই বারবার আটকে গেছে নতুন কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, রপ্তানি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রক্রিয়া।

২০২৬ সালে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ আইন কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রচার, শিল্পাঞ্চল ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) কার্যক্রমকে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। নতুন এই কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে গত ২০ আগস্ট থেকে যাত্রা শুরু করেছে। অতীতে একজন বড় বিনিয়োগকারীকে ভূমি, পরিবেশ, কর, শুল্ক, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, নির্মাণ অনুমোদন, মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানি, ভিসা ও কর্মানুমতির মতো বিভিন্ন প্রয়োজনে বহু মন্ত্রণালয় ও সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হতো। এখন এই একীভবন যদি কেবল সাইনবোর্ড পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে বিনিয়োগকারীর অভিজ্ঞতায় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না।

নতুন এই প্রতিষ্ঠানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগের আগ্রহকে প্রকৃত উৎপাদনে রূপান্তর করা। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়ে ১৭৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। সংখ্যাটি আশাব্যঞ্জক মনে হলেও এর ভেতরের চিত্র সতর্কতার দাবি রাখে। কারণ, এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে দেশে ইতিমধ্যে কার্যরত বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ থেকে। নতুন ইকুইটি মূলধন বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ, যা নির্দেশ করে যে নতুন বিদেশি মালিকানাধীন বিনিয়োগ প্রায় স্থির ছিল।

ভবিষ্যতে সাফল্যের সূচক হিসেবে কতটি রোডশো হলো, কতটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হলো কিংবা কতজন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে বৈঠক হলো—এসবকে প্রধান বিবেচনা করা উচিত নয়। প্রকৃত সূচক হওয়া দরকার কত ডলারের নতুন মূলধন এসেছে, কতটি কারখানা উৎপাদনে গেছে, কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, কতটা প্রযুক্তি স্থানান্তর ঘটেছে এবং কত নতুন রপ্তানিপণ্য তৈরি হয়েছে। সম্পূর্ণ আবেদন পাওয়ার পর সব সরকারি অনুমোদন সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নীতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পুনর্বিন্যাস বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা, সরবরাহব্যবস্থায় মহামারির অভিঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সমুদ্রপথের অনিশ্চয়তা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তাদের উৎপাদনকেন্দ্র বৈচিত্র্যময় করতে বাধ্য করছে। ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশলের অধীনে তারা চীনের পাশাপাশি অন্য দেশেও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের ভূকৌশলগত অবস্থান এখানে বড় শক্তি। দেশটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের জন্য বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের সম্ভাব্য দুয়ার। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বে টার্মিনাল এবং আঞ্চলিক মহাসড়ক ও রেল সংযোগ পরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন হলে তা বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

বিনিয়োগ কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বহুমুখী পথ অবলম্বন করতে হবে। চীন অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে, জাপান মাতারবাড়ী ও বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্টের মাধ্যমে এবং ভারত যোগাযোগ ও জ্বালানি খাতে বড় অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার এবং সবুজ শিল্পায়ন ও শ্রমমান রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। কোনো একটি শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা না রেখে জাতীয় স্বার্থ, আর্থিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও ঋণঝুঁকির ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচন করতে হবে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এটি কার্যকর হলে বিনিয়োগকারী একটি ড্যাশবোর্ডে আবেদন থেকে শুরু করে অনুমোদনের বর্তমান অবস্থা দেখতে পারবেন। তবে এর পাশাপাশি প্রতিটি বড় প্রকল্পের জন্য একজন ক্ষমতাপ্রাপ্ত ‘কেস অফিসার’ থাকা প্রয়োজন, যিনি আবেদন থেকে কারখানা উৎপাদনে যাওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের দায়িত্বে থাকবেন। এছাড়া একীভূত কর্তৃপক্ষের অধীনে শিল্পাঞ্চল ও পিপিপি থাকায় ভূমি ও অবকাঠামোর সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তবে এখানে স্বার্থের সংঘাত ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি মোকাবিলায় আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ জরুরি।

ইনভেস্ট বাংলাদেশকে কেবল একটি বাণিজ্য প্রচার সংস্থা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। প্রতিষ্ঠানটির কাজ হবে বিনিয়োগকারীর পথ পরিষ্কার করা, স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে বিদেশি মূলধনের সংযোগ ঘটানো এবং ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ইলেকট্রনিকসের মতো খাতে প্রযুক্তি ও দক্ষতা গড়ে তোলা। বাংলাদেশকে স্বল্পমূল্যের শ্রমের গল্প থেকে বেরিয়ে এসে কার্বন নিঃসরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শ্রমমান ও সাইবার নিরাপত্তার মতো আধুনিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। এলডিসি উত্তরণের পর বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। প্রকৃত সংস্কার তখনই হবে, যখন বিনিয়োগকারীর সময়কে রাষ্ট্র মূল্যবান মনে করবে এবং অনুমোদনের অনিশ্চয়তা দূর হবে। চাকরির আরও তথ্য: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিডা, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বেজা এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ পিপিপিএকে একীভূত করে গঠিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সেই পুরনো অচলাবস্থা ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি করেছে। চাকরির আরও তথ্য: কিন্তু বিনিয়োগকারীর অভিজ্ঞতা না বদলালে এই একীভবন শেষ পর্যন্ত কয়েকটি সাইনবোর্ড বদলানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। চাকরির আরও তথ্য: এটি একদিকে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের আস্থার ইঙ্গিত, অন্যদিকে নতুন বড় বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের দুর্বলতাও প্রকাশ করে। চাকরির আরও তথ্য: কোম্পানিগুলোকে শুধু সাধারণ আমন্ত্রণ জানালে হবে না। চাকরির আরও তথ্য: কেন তারা বাংলাদেশে আসবে, কোথায় জমি পাবে, কত দিনে অনুমোদন মিলবে, কীভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিশ্চিত হবে, স্থানীয় কোন প্রতিষ্ঠান তাদের সরবরাহকারী হতে পারবে এবং বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য কোন বাজারে শুল্কসুবিধা পাবে এসব প্রশ্নের কোম্পানিভিত্তিক উত্তর দিতে হবে। চাকরির আরও তথ্য: ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া এই সুযোগ কাজে লাগাতে সক্রিয়। চাকরির আরও তথ্য: বাংলাদেশকেও একই প্রতিযোগিতায় নামতে হবে।