দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো ঘোষণা করেছে সরকার। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় বেতন না বাড়ায় সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান কমে গিয়েছিল বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান ও উভয় দিকের ভারসাম্য রক্ষা করতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সমপ্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে মানুষের হাতে অর্থ বাড়ায় মূল্যস্ফীতির কিছুটা ঝুঁকি থাকলেও পে-স্কেল একবারে নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হওয়ায় তা সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে।
তবে এই বেতন কাঠামো নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ নতুন এই বেতন কাঠামোকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, এটি আরও আগে হওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারি এই সিদ্ধান্তের ফলে বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। তিনি পরামর্শ দেন, সরকারি খাতে অপ্রয়োজনীয় লোকবল কমিয়ে ব্যয় সংকোচন করা যেতে পারে। এদিকে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে, যা সরকারের অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের (এডিপি) অর্থ কাটছাঁট করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, অতীতে বেতন বৃদ্ধির সময়গুলোতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে, এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, প্রায় ১০ বছর আগে সর্বশেষ সরকারি বেতন কাঠামো পরিবর্তন হয়েছিল। এই দীর্ঘ সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে, তাই বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা ছিল। তিনি বলেন, বেতন বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব কতটুকু পড়বে তা নির্ভর করবে অর্থের উৎস, বেতন বৃদ্ধির হার, বাস্তবায়নের গতি এবং মুদ্রা ও রাজস্বনীতির সমন্বয়ের ওপর। তিনি বাড়তি বেতন ব্যয়ের অর্থ ব্যাংক ঋণ বা টাকা ছাপিয়ে না জুগিয়ে কর ফাঁকি রোধ ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর মাধ্যমে সংগ্রহের পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরী বলেন, সরকারের সামনে বেতন বাড়ানোর দাবি বিবেচনা করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। তবে তিনি সতর্ক করেন যে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বেসরকারি খাতে কর্মরতদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে। সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, বর্তমানে ব্যবসা-বাণিজ্য শ্লথ এবং বেসরকারি খাত চাপের মুখে রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমানো না হয়। এছাড়া টাকা ছাপিয়ে বেতন-ভাতা প্রদানের ঝুঁকি এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান তিনি।
বেসরকারি খাতের সংকটের কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের বেতন বাড়ানোর সক্ষমতা নেই। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় তারা এই চাপ সহ্য করতে পারবে না। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে না ধরে পে-স্কেল ঘোষণা করায় পণ্য ও সেবা খাতের দাম আরও বাড়তে পারে, যা নির্দিষ্ট আয়ের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারা আরও বলেছেন, সরকারের আর্থিক টানাপড়েনের মধ্যে অর্থের জোগান দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। চাকরির আরও তথ্য: বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে যে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হবে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়াতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার মতে, আরেকটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। চাকরির আরও তথ্য: সার্বিক পরিস্থিতিতে যারা বেসরকারি খাতে আছেন, তাদের বেতন বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যদিও সরকারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়, তারপরও সরকারকে বাধ্য হয়ে এ কাজটি করতে হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি না এলে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে না। চাকরির আরও তথ্য: ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা না থাকলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা কিন্তু তাদের কর্মীদের বেতন বাড়াতে আগ্রহী হবেন না।



