ইলিশের আকাল ও জেলের ঋণ: রুপালি মাছের সংকটে বিপর্যস্ত

, বাংলাদেশ

ইলিশের আকাল ও জেলের ঋণ: রুপালি মাছের সংকটে বিপর্যস্ত

ভরা মৌসুমে ইলিশের মৌসুমে নৌকাগুলো ঘাটে ফিরছে ঠিকই, কিন্তু ঝুড়ি ভরে রুপালি মাছ উঠছে না। ইলিশ আসছে আগের তুলনায় অনেক কম এবং আকারেও ছোট। চাঁদপুরের আড়তে তিন বছর আগেও জুলাইয়ের পর দিনে গড়ে দুই হাজার মণ ইলিশ আসত, যা গত বছর ৪০০ মণে নেমে আসে। এবার সেই সংখ্যা আড়াই শ মণের নিচে। বরিশালের পোর্ট রোড মোকামেও সম্প্রতি একদিনে মাত্র ৫০ মণের মতো ইলিশের আমদানি হয়েছে।

দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে এবং জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ১ শতাংশ। প্রায় সাত লাখ জেলে সরাসরি এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে দুই লাখ ৯৫ হাজার টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল। জাটকা রক্ষার দীর্ঘ প্রচেষ্টায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা রেকর্ড পাঁচ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টনে পৌঁছায়। কিন্তু সেই সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আহরণ কমে পাঁচ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে দাঁড়ায় এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে প্রায় পাঁচ লাখ টনে নেমে আসে। গত দুই বছরেই আমরা প্রায় ৭১ হাজার টন ইলিশ হারিয়েছি। গত বছরের জুলাই-আগস্টে আহরণ তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৯ শতাংশ কম ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো না মিললেও বর্তমান মৌসুমের চিত্র উদ্বেগজনক।

মাছ কম পাওয়ার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জেলেদের জীবনে। বরগুনায় একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়। জ্বালানি, বরফ, জাল ও খাবার বাবদ এই অর্থ অনেক সময় ধার করে জোগাড় করতে হয়। কিন্তু চার দিন সাগরে কাটিয়েও অনেক জেলের পক্ষে খরচের টাকা ওঠানো সম্ভব হচ্ছে না। মাছের আকার ছোট হওয়ায় দামও পাচ্ছেন কম। সাত বছর আগে ইলিশের গড় ওজন ছিল ৫০০ থেকে ৫৫০ গ্রাম, যা এখন ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম। দৈর্ঘ্যও ২০২২-২৩ সালের ৩৭ দশমিক ২ সেন্টিমিটার থেকে কমে ২০২৫-২৬ সালে ৩৪ সেন্টিমিটারে নেমে এসেছে। জুলাই মাসে বরগুনার ঘাটে বড় ইলিশ কেজিপ্রতি এক হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হলেও ছোট ইলিশের দাম ছিল মাত্র ৬০০ টাকা।

জেলেদের পিছু ছাড়ছে না দাদনের অদৃশ্য শিকল। মাছ বিক্রির পরপরই মহাজনের কিস্তি কেটে নেওয়া হয়। ভোলার চরফ্যাশনের এক জেলে ৬৬ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেও খরচ ও দাদনের কিস্তি মেটানোর পর খালি হাতেই ঘরে ফিরেছেন। খারাপ মৌসুমের কারণে দেনা শোধের বদলে বাড়ছে ঋণের পাহাড়। এর ওপর নিষেধাজ্ঞার দিনগুলোর কষ্ট তো আছেই। ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিনের সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞায় একজন জেলে সহায়তা হিসেবে পেয়েছেন মাত্র ৭৭ কেজি চাল, যা পরিবারের দুই মাসের জন্য পর্যাপ্ত নয়। নিবন্ধিত জেলের তুলনায় সহায়তার সংখ্যা কম, আবার নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছেন হাজার হাজার জেলে।

সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো মাছের প্রজনন হার কমে যাওয়া। এ বছর ধরা পড়া ইলিশের মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশের পেটে ডিম পাওয়া গেছে, যা দু-তিন বছর আগেও ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। উপকূলের অগভীর সাগরে ট্রলিং বোটের দাপটে জাটকা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উপকূলের ৪০ মিটারের কম গভীর জলকে নার্সারি হিসেবে ঘোষণা করা হলেও সেখানে চলছে ট্রলিং। বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম উপকূলের অনেক কাঠের ট্রলারকে আধুনিক ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হয়েছে। শুধু পটুয়াখালীর মহিপুর-আলীপুরে এমন বোটের সংখ্যা গত বছরের ৪০-৪৫টি থেকে বেড়ে ৬০টিতে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া গভীর সমুদ্রের ২৬৮টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারও নিয়ম ভেঙে অগভীর জলে ঢুকে পড়ছে।

নদীর অবস্থাও ইলিশের জন্য প্রতিকূল হয়ে উঠেছে। দূষণ ও ডুবোচরের কারণে ইলিশের বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। মেঘনায় ইলিশের প্রধান খাদ্য প্ল্যাংকটন ৬৮ শতাংশ কমেছে। ১৯০১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশের গড় তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ায় প্রজননও ব্যাহত হচ্ছে। বাজারের চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়; ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইলিশের খুচরা দাম প্রায় ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। কারওয়ান বাজারে গত বছর যে ইলিশের দাম ছিল এক হাজার ৮০০ টাকা, তা এখন দুই হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রপ্তানি বাণিজ্যেও বড় পতন ঘটেছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে সাড়ে আট হাজার টনের বেশি ইলিশ রপ্তানি করা হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৫৭৪ টনে নেমে এসেছে। উল্টো আমরা এখন গুজরাট থেকে ৫০০ টন ইলিশ আমদানি করছি। অথচ ২০২০ সালে ইলিশের উৎপাদন ৫৩ হাজার টন বাড়ানোর লক্ষ্যে ২২৯ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিক্যে জেলের হাত থেকে ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে ইলিশের দাম প্রতি ধাপে প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

আগামী ৮ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকবে। এই সময় মা ইলিশ ডিম ছাড়বে, যা আগামী মৌসুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলের সংসারের চাকা সচল রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। উপকূলের ৪০ মিটারের কম গভীর জলে ট্রলিং নিষিদ্ধ করা, জালের মান নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর নাব্যতা ফেরানো জরুরি। প্রকৃত জেলেদের তালিকা প্রণয়ন করে সঠিক প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ব্যবস্থা করা গেলেই এই রুপালি ইলিশের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া মণের পেছনে আছে কোনো জেলের না মেটানো দাদনের কিস্তি, কোনো সংসারের টান পড়া চাল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুই বছরে হারিয়েছি প্রায় ৭১ হাজার টন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু এবারের ভরা মৌসুমের ঘাট বলছে, পতন থামেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জেলের কাছে এই পতনের মানে খুব সরল, আর সে কারণেই নির্মম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ মৌসুমে সেখানকার জেলেরা চার দিন নদীতে কাটিয়েও খরচের টাকা তুলতে পারেননি, তিন দিন সাগরে ভেসে ফিরেছেন অল্প কিছু মাছ নিয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জাল যত হালকা হয়, জেলের বুক তত ভারী হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইলিশ কমছে আকারেও, আর সেই ক্ষতও জেলের পকেটে গিয়ে পড়ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জুলাইয়ে বরগুনার ঘাটে বড় ইলিশ বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি এক হাজার ২০০ টাকায়, মাঝারি ৯০০ টাকায়, ছোট মাত্র ৬০০ টাকায়।