মানবাধিকার সংস্কারের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস হওয়া তিনটি নতুন আইন মূলত মানবাধিকার সুরক্ষার পথকে সংকুচিত করেছে। এইচআরডব্লিউর মতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মানবাধিকার রক্ষায় যে আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছিল, নতুন আইনের মাধ্যমে তা শিথিল করা হয়েছে। এর ফলে অতীতের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর সুরক্ষাব্যবস্থা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার পর তারা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও তদন্ত ক্ষমতা খর্ব করেছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে কমিশনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছিল, যার আওতায় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষমতা, স্বাধীন নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং নিজস্ব জনবল কাঠামোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই অধ্যাদেশ কার্যকর হতে দেয়নি। গত ৬ সেপ্টেম্বর পাস হওয়া নতুন আইনে মানবাধিকার কমিশনকে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি; সংস্থাটি এখন কেবল প্রতিবেদন তলব করতে পারে। যদিও অস্পষ্ট একটি ধারায় নিজস্ব অনুসন্ধানের সুযোগ রাখা হয়েছে, তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগের বিষয়টিও উঠে এসেছে এইচআরডব্লিউর পর্যবেক্ষণে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে গুমের তদন্ত ও গোপন বন্দিশালা পরিদর্শনের যে ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল, নতুন আইনে তা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধির মানদণ্ড অনুযায়ী কমান্ডিং অফিসারকে দায়ী করার যে বিধান ছিল, তা শিথিল করে নতুন আইনে নির্দেশের সরাসরি প্রমাণ উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা হয়েছে। এটি অপরাধীদের দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
আধা-সামরিক বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) নিয়ে সরকারের অবস্থানও সমালোচনার মুখে পড়েছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর পাস হওয়া স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন অনুযায়ী, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত র্যাবকে বিলুপ্ত না করে কেবল নাম পরিবর্তন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) করা হয়েছে। নতুন বাহিনীর লোগো একই রাখা হয়েছে এবং পুরাতন ব্যাটালিয়নের সব সদস্য, সম্পদ ও নথি এতে স্থানান্তর করা হয়েছে। অথচ বাহিনীটির সাবেক সাতজন শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং বেশ কয়েকজন সদস্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি। মে মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার আশা প্রকাশ করলেও বিশেষজ্ঞরা নতুন আইনে কোনো কার্যকর জবাবদিহিতা বা নজরদারির বিধান দেখতে পাচ্ছেন না।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাবেক সরকারের আমলে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও বলপ্রয়োগের ঘটনা নিয়মিত ছিল। এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলাইন পিয়ারসন বলেন, অতীতে জীবন বাজি রেখে যারা লড়াই করেছেন, তারা সংস্কারের প্রতিশ্রুতিতেই তারেক রহমানকে ক্ষমতায় এনেছিলেন। বর্তমান সরকার নিরাপত্তা বাহিনীকে নজরদারি থেকে আড়াল করায় ভবিষ্যতে একই ধারার অপরাধ ফিরে আসার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। তাই মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং নিরাপত্তা খাতে বাস্তবমুখী সংস্কারের প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের এখনই সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা জরুরি বলে সংস্থাটি মনে করে। চাকরির আরও তথ্য: সংস্থাটি আরও উল্লেখ করে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, যার মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, জোরপূর্বক গুম, সমালোচকদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার। চাকরির আরও তথ্য: বর্তমানে হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও আগের সরকারের মতোই তারেক রহমান সরকারও শত শত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বিচারে আটকে রেখেছে। চাকরির আরও তথ্য: তৎকালীন আইনে সরকার বা সরকার-ঘনিষ্ঠদের প্রাধান্য থাকা একটি কমিটির মাধ্যমে কমিশনারদের বাছাই করা হতো। চাকরির আরও তথ্য: প্রথমবারের মতো নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদের প্রটোকল অনুযায়ী গোপন বন্দিশালা বা আটককেন্দ্রগুলো পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে একটি জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গঠন করা হয়। চাকরির আরও তথ্য: তবে ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর এই অধ্যাদেশটি সংসদে অনুমোদন করার প্রয়োজন ছিল, অন্যথায় তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যেত। চাকরির আরও তথ্য: তবে অস্পষ্ট একটি ধারায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট বাহিনী সাড়া না দিলে বা প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে কমিশন নিজস্ব অনুসন্ধান শুরু করতে পারবে।



