রাজধানীর মিরপুরের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রাড্ডা এমসিএইচ কার্যালয় ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চালানো ভয়াবহ লুটপাট ও তাণ্ডবের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে লুট হওয়া দুই ট্রাক মালামাল উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ঘটনার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও নেপথ্যের মূল ইন্ধনদাতা বা নির্দেশদাতাদের পরিচয় এখনো মেলেনি, এমনকি কাউকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ঘটনার পর দফায় দফায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিরা। রাতের আঁধারে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কেন এভাবে হামলা-ভাঙচুর চালানো হলো, এই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, পুরো ঘটনাটি একটি সুপরিকল্পিত জমি দখল প্রক্রিয়ার অংশ। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের মদতেই এই তাণ্ডব চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকের মতে, পুলিশের উপস্থিতিতেই এই হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল, যা পুলিশের পেশাদারিত্ব নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী মতলব জানিয়েছেন, শাহ-আলী পীরের স্মৃতিবিজড়িত এই বিশাল সম্পত্তির ওপর নজর পড়েছে এক প্রভাবশালী পক্ষের, যারা সুযোগ বুঝে জমিটি দখল করতে মরিয়া। বাহার নামের আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, হামলা চলার সময় পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকলেও তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি, যার ব্যাখ্যা তাদের কাছে চাওয়া উচিত। বিভিন্ন সূত্র বলছে, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের ছত্রছায়ায় ঘটনাটি ঘটেছে। প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট, দায়ের করা মামলার এজাহার ও স্থানীয়সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটি জমি দখল সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই ঘটানো হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সরকারের আমলে বিভিন্ন সরকারের এমপি মন্ত্রীরা টাকা-পয়সার বিনিময়ে অনেক জমি দখল করে নেয়। এখন জায়গা জমির দাম বেড়েছে বলে এই জায়গার প্রতি লোভ জন্মে গেছে এক পক্ষের।
এই ঘটনার নেপথ্যে স্থানীয় সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার যোগসাজশ থাকার গুঞ্জন ছড়িয়েছে। ঘটনাস্থলে টানানো ‘সমমনা সমবায় সমিতি’র সাইনবোর্ডের সঙ্গে এমপি মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি সাড়া দেননি। অপরদিকে, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানিয়েছেন, ঘটনার সঙ্গে দলীয় কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা ১৫ মিনিটে হাসপাতালের সামনে একটি ট্রাক আসে। এরপর একটি বিশাল এস্কেভেটর এনে রাত ১টার দিকে তা দিয়ে ভবনের ভেতরে তাণ্ডব চালানো হয়। কোনো প্রকার মাস্ক ছাড়াই একদল দুর্বৃত্ত সেখানে ঢুকে পড়ে। যুবদলের মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব সাজ্জাদুল মিরাজ সেই রাতে ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেছিলেন যে, তার পক্ষ থেকে শাহআলী থানার ওসিকে বিষয়টি আগেভাগে জানানো হয়েছিল, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সেখানে বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং দখলদারদের সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেন। তিনি এই হামলায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও পুলিশের যোগসাজশের অভিযোগ তুলে তদন্ত দাবি করেছেন।
তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে ডিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানিয়েছেন, মামলাটি তদন্তাধীন। তদন্তের চূড়ান্ত পর্যায়ে কারা নেপথ্যে জড়িত তা বেরিয়ে আসবে। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক ড. নাসরিন আখতার বলেন, তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তবে যারা নির্দেশদাতা তারা কেন এখনো ধরা পড়ছে না, সেটিই তাদের বড় প্রশ্ন। তারা কেন কিছু করলো না এই প্রশ্নের জবাব পুলিশকে দিতে হবে।
এদিকে পুলিশের ভূমিকা ও দায়িত্বে অবহেলার দায়ে শাহআলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রশাসনিক কারণে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাকে কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে যুক্ত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রোববার সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিশ্চিত করেন যে, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার জানান, শনিবার রাতেই ওসি দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন।



