সামাজিক পরিসরে অসহিষ্ণুতার বিস্তার: উদ্বেগের কারণ ও প্রতিকারের পথ

, বাংলাদেশ

সামাজিক পরিসরে অসহিষ্ণুতার বিস্তার: উদ্বেগের কারণ ও প্রতিকারের পথ

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে তীব্র অসহিষ্ণুতার চিত্র ফুটে উঠছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই প্রবণতা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। আমাদের সামাজিক সম্পর্কের গভীরতায় রাজনৈতিক প্রভাব যে ক্ষত তৈরি করছে, তা সমাজতাত্ত্বিক পর্যালোচনার দাবি রাখে। আমরা কি একটি সচেতন সমাজ গড়ে তুলছি, নাকি সমাজকে বিভাজিত করে ফেলছি, এই প্রশ্নটি এখন সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে এমন সব বক্তব্য ও আচরণ দেখি, যেখানে পরিষ্কারভাবে সহনশীলতার অভাব দেখা যায়। অনেক অসহিষ্ণু আচরণ কিংবা সহনশীলতার অভাবের অন্যতম কারণ হিসেবে আমরা সামাজিক পরিসরের অতিরাজনৈতিকীকরণকে দায়ী করি।

সামাজিক পরিসরের এই অতিরাজনৈতিকীকরণ বা অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন লাভ-লোকসান ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রক্রিয়ার তিনটি মূল ঝুঁকি রয়েছে। প্রথমত, শিক্ষা ও বিদ্যায়তনিক পরিসরের অতিরাজনীতি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হওয়ার বদলে রাজনৈতিক ক্ষমতাচর্চার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের বদলে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার প্রবণতা এবং শিক্ষকদের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দলীয়করণের বিষয়টি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। সামাজিক পরিসরের অতিরাজনৈতিকীকরণের কারণে আমরা দেখতে পাই সামাজিক সম্পর্ককে লাভ, লোকসান ও প্রাপ্তির সাপেক্ষে দেখার প্রবণতার বৃদ্ধি, যা আমাদের সামাজিক জীবনের একটি বড় সংকট। প্রথমত, শিক্ষা ও বিদ্যায়তনিক পরিসরের অতি মাত্রায় রাজনৈতিকীকরণের ফলে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ জ্ঞান তৈরি করা, সেগুলোই ক্রমাগতভাবে হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ক্ষমতাচর্চার একটি অন্যতম ক্ষেত্র। যেখানে আমরা চাই ছাত্র-ছাত্রীরা আরও রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠবে, সেখানে আমরা দেখছি তারা ক্রমাগতভাবে কূটরাজনীতির বলিতে পরিণত হচ্ছে এবং রাজনৈতিক যুক্ততাকে দেখা হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে রাজনীতির চরম অনুপ্রবেশ। গত দেড় দশকে সামাজিক কাঠামোর যে পরিবর্তন হয়েছে, তাতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিয়েরে বুর্দ্যের ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বা সামাজিক পুঁজির যে ধারণা ছিল, তা এখনকার বাংলাদেশে পুরোপুরি পণ্যমূল্য পেয়েছে। সামাজিক অবস্থান এখন কেবল মর্যাদার বিষয় নয়, বরং অনৈতিক প্রতিযোগিতার এক দৃশ্যমান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

তৃতীয়ত, ধর্ম ও সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনীতির এক অদ্ভুত মিথস্ক্রিয়া আমাদের জাতিগতভাবে বিভক্ত করে রেখেছে। গান বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনুগত হিসেবে দেখার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠী নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, যার ফলে সৃজনশীল পরিসরগুলো মানুষের জন্য ভীতিকর হয়ে উঠছে।

সহনশীলতার অভাব এখানে মতাদর্শগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। আপনি যদি নির্দিষ্ট কোনো ক্ষমতাবান মতাদর্শের অনুসারী না হন, তবে আপনাকে সমাজ থেকে ‘অন্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই ‘অন্যতা’ তৈরি করা হয় রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবানদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে। এভাবে সমাজ পক্ষ ও বিপক্ষ হিসেবে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের মূল ভিত্তি হলো নানা মত ও পথের সহাবস্থান। কিন্তু যখন সেই সহাবস্থান নষ্ট হয়, তখন সমাজ নিপীড়নের ক্ষেত্রে পরিণত হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের প্রতি আক্রমণ বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে অশালীন ভাষার ব্যবহার এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলচ্চিত্রশিল্পী বাঁধনের ওপর সাম্প্রতিক নিপীড়নের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সামাজিক পরিসর এখন রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার জায়গায় পরিণত হয়েছে। এমনকি সংসদ থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে অশালীন ভাষা ব্যবহারের মতো ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সিফাত নামের একজনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা বাক্‌স্বাধীনতার সীমা ও যথাযথ ভাষা ব্যবহারের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে সহনশীলতার অভাব আমাদের সামাজিক সংহতি নষ্ট করে দিচ্ছে। যদি রাজনীতিবিদেরা তাদের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন না আনেন, তবে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা অসম্ভব। রাজনীতি যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একমাত্র চালিকাশক্তি না হয়ে ওঠে, সেদিকে সচেতন নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকী মনে করেন, প্রথাগত রাজনৈতিকীকরণ থেকে বেরিয়ে এসে সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। সমাজ ও তার সামাজিক সম্পর্ক যদি প্রথাগত রাজনৈতিক বলয় দ্বারা নির্ধারিত হয়, তাহলে সেটি একটি সমাজব্যবস্থার গভীর ক্ষতকেই নির্দেশ করে।