ইয়েমেন সংঘাত ও হুতি হামলা

, বিশ্ব

ইয়েমেন সংঘাত ও হুতি হামলা

দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ থেকে সরে এসে অর্থনীতি, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে মনোযোগী ছিল সৌদি আরব। তবে ইয়েমেনের বর্তমান সংঘাত রিয়াদের সেই ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা কৌশলের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করেছে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো এবং বিভিন্ন শহরে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু সেই পরিকল্পনাতেই এখন বড় ধাক্কা দিচ্ছে ইয়েমেনের নতুন সংঘাত। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটির অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন এবং বড় ক্রীড়া আয়োজনের কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আবুধাবির অধীনে দীর্ঘদিন লড়াই করা হাজারো যোদ্ধাও সৌদির নতুন কৌশলের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেননি।

প্রায় ১১ বছর ধরে সামরিক অভিযান ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ইয়েমেনের সংঘাত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ ২০২২ সালের পর থেকে আবারও চরম আকার ধারণ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রিয়াদ হুতিদের আকস্মিক হামলার জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুত ছিল না, যার ফলে তাদের সামগ্রিক সামরিক ও আঞ্চলিক কৌশলে বড় ধরনের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কয়েক বছরের তুলনামূলক শান্ত অবস্থার পর চলতি গ্রীষ্মে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবারও তীব্র হয়ে ওঠে। পাল্টা জবাবে সৌদি বাহিনীও হুতিদের লক্ষ্য করে শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে।

ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের জোটে ফাটল এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। গত বছর ইয়েমেনে ইউএইর সামরিক যানে সৌদি যুদ্ধবিমানের হামলার ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর জেরে আবুধাবি তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নিলে ইয়েমেনে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তার মতে, ইউএইর সেনারা চলে যাওয়ার সময় দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি যথাযথ ছিল না এবং সৌদি আরব তাদের দক্ষ কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকর বিকল্প গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইয়েমেনের কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এছাড়া হুতিরা যুদ্ধবিরতি বাতিল করে সৌদি জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশেষজ্ঞ আহমেদ নাগি মনে করেন, সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সাথে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং কয়েকটি অঞ্চল হাতছাড়া হওয়ার ফলে ওই বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়েছে। অন্যদিকে হুতিদের হাতে থাকা উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র সৌদি আরবের গভীরে আঘাত হানতে সক্ষম।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর অতি-নির্ভরশীলতাকেও সৌদি আরবের একটি বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখছেন অনেকে। গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে দুইবার ফোনে কথা বলে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলার অনুরোধ জানান। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে সরাসরি জড়াতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে সৌদি আরবের নিজস্ব সামরিক কাঠামো ও যুদ্ধের প্রস্তুতির দুর্বলতাগুলো প্রকাশ্যে চলে আসে।

বর্তমানে পরিস্থিতি সামাল দিতে রিয়াদ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দ্বারস্থ হয়েছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সাথে বৈঠক করেছেন সৌদি যুবরাজ এবং আঞ্চলিক সহায়তার জন্য ইউএইর ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

ফ্রান্স সৌদি আরবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও কর্মী পাঠাতে রাজি হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্য যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের জন্য উড়োজাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করার জন্য শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত আছেন।

গত সোমবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র আওতায় সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে একমত হয়েছে। এর মাধ্যমে তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে ইউএই-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর হুতিবিরোধী অভিযানে অংশগ্রহণ সৌদি ও আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের একটি সংকেত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ইয়েমেনের এই সংঘাতের মানবিক ক্ষয়ক্ষতিও ব্যাপক। সাম্প্রতিক হুতি হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন এবং চারজন বাংলাদেশি নাগরিক আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ঢাকা থেকে যাওয়া প্রায় ৩ হাজার প্রবাসী শ্রমিক সেখানে আটকে পড়েছেন বলে জানা গেছে। গত মাসে সংঘাতের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এতে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তেলের দাম বেড়ে যায়।

তবে ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমাইসির মতে, বাইরের দেশের সামরিক সহায়তা কিংবা সাময়িক সাফল্য ইয়েমেন সমস্যার স্থায়ী সমাধান আনতে পারবে না। জোটের অভ্যন্তরীণ কমান্ড সেন্টারের সমন্বয়হীনতা এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরোধ নিরসন না হলে সামরিক অর্জনগুলো দীর্ঘমেয়াদে অকার্যকর হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক বিরোধের গভীর ছায়া ইয়েমেনের এই সংঘাতে বিদ্যমান। ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কের টানাপোড়েন অব্যাহত থাকলে সৌদি আরবকে চাপে রাখতে ইরান হুতিদের সমর্থন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে, সামরিক অভিযান ও কূটনৈতিক সমাধানের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সৌদি আরবকে তাদের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন এজেন্ডা নতুন করে পুনর্বিন্যাস করার চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে। পাশাপাশি সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্র কতটা পাশে থাকবে, তা নিয়েও রিয়াদের মূল্যায়নে ভুল ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।