আগামী ২৭শে অক্টোবর ইসরাইলে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে পরাজয় ঘটলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ ক্ষমতার অবসান ঘটবে। তাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে দেশটির প্রধান চারটি বিরোধী দল একজোট হয়েছে। এই জোটে রয়েছে ইয়াশার পার্টি, দ্য ডেমোক্রেটস, ইসরাইল বেইতেনু এবং টুগেদার অ্যালায়েন্স। রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা থাকলেও ‘ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকে শক্তিশালী করার’ লক্ষ্য নিয়ে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আগামী ২৭ তারিখ ইসরাইলে সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনে হেরে গেলে বিদায় নিতে হবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে। টুগেদার জোট ১৩ এবং ইসরাইল বেইতেনু ও ডেমোক্রেটস প্রত্যেকে ৯টি করে আসন পেতে পারে।
নির্বাচনকে ঘিরে দেশটিতে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ দেখা দিয়েছে। জনমত জরিপ অনুযায়ী, কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার মতো অবস্থানে নেই। দুর্নীতি, নিরাপত্তা ঝুঁকি, সামরিক সেবায় কট্টরপন্থিদের ছাড় দেওয়া এবং আরব দলগুলোকে প্রান্তিকীকরণের মতো অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে দেশটি বিভক্ত। এর পাশাপাশি গাজা ও লেবাননে চলমান সামরিক অভিযান এবং পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতিস্থাপনকারীদের তাণ্ডবের জেরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রবল চাপের মুখে রয়েছে ইসরাইল। এই নির্বাচন তাই দেশটির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। দুর্নীতি, নিরাপত্তা ব্যর্থতা, উগ্র-গোঁড়া ইহুদিদের সামরিক সেবা থেকে বিরত রাখা এবং আরব দলগুলোকে রাজনীতি থেকে বাদ দেয়ার চেষ্টার মতো নানা অভ্যন্তরীণ সংকটে ইসরাইল এখন বিভক্ত।
গত ২৬শে সেপ্টেম্বর বিরোধী নেতারা একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছেন, যার আওতায় নির্বাচনের আগে একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ না করার এবং নির্বাচনের পর সরকার গঠনে ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই বিরোধী শিবিরের নেসেটে প্রধান নেতা ইয়াইর লাপিদ এবং গাদি আইজেনকোট, নাফতালি বেনেট, আভিগদোর লিবারম্যান ও ইয়াইর গোলানের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতারা রয়েছেন। গাদি আইজেনকোটকে প্রধানমন্ত্রী পদের প্রধান দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। চ্যানেল ১২-এর জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি ২৩টি আসন পেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে, যেখানে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেতে পারে ২১টি আসন। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের বিপরীতে বিরোধী জোট ৫৪টি এবং নেতানিয়াহু জোট ৪৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চ্যানেল ১২-এর জরিপ অনুযায়ী, ১২০ আসনের নেসেটে আইজেনকোটের ইয়াশার ২৩টি আসন পেয়ে শীর্ষে থাকতে পারে। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেতে পারে ২১ আসন।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর পতন হলেও ফিলিস্তিনিদের জন্য পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। রয়্যাল হলোওয়ে ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ সামের জাবেরের মতে, বিরোধী শিবিরের নেতাদের অনেকেই কট্টর ডানপন্থি। যেমন, সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোট ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে ‘অলীক কল্পনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তিনি বসতি সম্প্রসারণে বিশ্বাসী। নাফতালি বেনেট নিজেকে নেতানিয়াহুর চেয়েও বেশি ডানপন্থি হিসেবে তুলে ধরেন, যিনি ফিলিস্তিনিদের দেখামাত্র গুলির পক্ষে এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ঘোর বিরোধী। কেননা যেই প্রধানমন্ত্রী হোক ইসরাইলিদের দীর্ঘদিনের যে রাষ্ট্রীয় নীতি তাতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
একইভাবে, লিবারম্যানের দল ইসরাইল বেইতেনু পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশ এলাকা ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত করা এবং গাজায় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করার দাবি তোলে। কেবল দ্য ডেমোক্রেটসের ইয়াইর গোলান দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথা বললেও, তার শর্ত হলো ফিলিস্তিনকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র হতে হবে এবং নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে ইসরাইলের হাতে। পিউ রিসার্চের জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ১৭ শতাংশ ইসরাইলি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিতে সহাবস্থানের সম্ভাবনা দেখেন।
আন্তর্জাতিক সংকট বিষয়ক বিশ্লেষক আমজাদ ইরাকি মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য বড় কোনো আশার আলো নেই। তবে তিনি মনে করেন, উগ্র সরকারের পতন হলে চরমপন্থি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা কিছুটা কমে আসতে পারে এবং গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ কিছুটা সুগম হতে পারে। ফিলিস্তিনিদের জন্য প্রতিটি জীবন রক্ষা ও নিজেদের ভূমি টিকিয়ে রাখাই বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নেতানিয়াহু বিদায় নিলেও ফিলিস্তিনিদের জন্য তা সামান্যই পরিবর্তন আনবে।



