ক্রমশ আন্তর্জাতিক চাপে ইসরাইল: ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী

, বিশ্ব

ক্রমশ আন্তর্জাতিক চাপে ইসরাইল: ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী

২০২৩ সালে ইসরাইলের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের সময় ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন সংহতি প্রকাশ করে বলেছিলেন, ইউরোপ ও ইসরাইল বন্ধু ও মিত্র হতে বাধ্য। ২৩শে এপ্রিল দেওয়া তার সেই বক্তব্যের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বর্তমানে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলেছে। গাজায় চলমান ইসরাইলি সামরিক অভিযান এবং সেখানে চালানো নৃশংসতার কারণে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে দেশটি। আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে স্পষ্ট বলেছেন, গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ড বিশ্বকে লজ্জিত করছে। একই সুরে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে সরাসরি গণহত্যা বলে নিন্দা জানিয়েছেন। ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের এপ্রিলে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার ব্যাপারে ৯২ শতাংশ ইহুদি ইসরাইলি উচ্চ মূল্যায়ন করেছেন। অন্যদিকে, ইহুদি পিপল পলিসি ইনস্টিটিউটের সেপ্টেম্বরে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৭২ শতাংশ ইহুদি ইসরাইলি গাজা থেকে ইসরাইলের সীমান্তে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি মেনে নিতে রাজি নন, যদি না ওই ভূখণ্ডের ভেতরে ইসরাইলি নিরাপত্তাবেষ্টনী বজায় রাখা হয়। আর বন্ধু মনে করে শতকরা ১৪ ভাগ। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে ঘটে যাওয়া ব্যর্থতাগুলোর তদন্ত এবং অতি-গোঁড়া ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব দৃশ্যমান। বৃটেন ইসরাইল প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা বেলফোর ঘোষণার ইতিহাস সত্ত্বেও এখন অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের জাতি নিধনকারী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সম্প্রতি ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীরের তাইবেহ গ্রামে জলপাই তোলা পরিদর্শনে আসা বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের কূটনীতিকদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে বড় প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। এর একদিন আগেই রামাল্লাহতে এক মার্কিন সাংবাদিকের ওপর হামলা চালায় উগ্র বসতি স্থাপনকারীরা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউরোপ ও ইসরাইলের মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা সহসা দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম। তা করা হলেও ক্ষতির প্রভাব দীর্ঘদিন থেকে যাবে।

আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরাইলে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের আগে এই সম্পর্কের টানাপোড়েন বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক ইয়োশি মেকেলবার্গের মতে, নেতানিয়াহু যদি উগ্র ডানপন্থী শক্তি নিয়ে ফের ক্ষমতায় ফেরেন, তবে বর্তমান পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে নেতানিয়াহুর পুনরায় জয়ী হওয়া ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও তলানিতে নিতে পারে। তবে ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গের নিকোলা পেরুগিনি সতর্ক করেছেন যে, গাজাবাসীর দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত হবে যদি এই নেতৃত্ব অপরিবর্তিত থাকে। বৃটেনের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন কিভাবে, কতটা হয়েছে গত তিন বছরে তা এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র লেকচারার নিকোলা পেরুগিনি সতর্ক করেন, যে নেতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে, তিনি যদি আবার নির্বাচিত হন তাহলে গাজার জনগণকে বাসযোগ্য নয় এমন পরিস্থিতির। তবে অধিক উদারপন্থি সরকারের অধীনে একটি ভিন্ন রকম সম্পর্ক দেখেন মেকেলবার্গ।

নির্বাচনী লড়াইয়ে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোটও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। গত বছর মিটভিম ইন্সটিটিউটের জরিপ অনুযায়ী, ৬৭ শতাংশ ইসরাইলি ইউরোপকে প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করেন। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার বদলালেও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের নীতিতে রাতারাতি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে উদারপন্থী কেউ ক্ষমতায় এলে ফিলিস্তিনিদের প্রতি মানবিক সহায়তা বাড়ানো বা বসতি সম্প্রসারণের গতি কিছুটা ধীর হওয়ার মতো যৌক্তিক আলোচনার পথ তৈরি হতে পারে। ফিলিস্তিনিদের ওপর অব্যাহত হত্যাকাণ্ডের নৈতিকতা কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির অবস্থান নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হলেও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন ৮০ শতাংশ।

গাজা যুদ্ধের শুরুতে পশ্চিমা বিশ্ব ইসরাইলকে সমর্থন দিলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনমতের চাপে তারা অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ট্রেড ইউনিয়ন, মানবাধিকার সংগঠন এবং লাখ লাখ মানুষের বিক্ষোভ সরকারগুলোর ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নেভে গর্ডন মনে করেন, ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন ইউরোপের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, বৃটেনে ইসরাইলবিরোধী জনমত ৬১ থেকে বেড়ে ৬৯ শতাংশ, ইতালিতে ৬৬ থেকে ৭৫ শতাংশ এবং জার্মানিতে ৬৪ থেকে ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গাজায় হত্যাযজ্ঞ বন্ধ এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা থামাতে পদক্ষেপ নেয়ার দাবিতে বিভিন্ন মহল থেকে ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা গেছে, ইসরাইল সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণকারী মানুষের অনুপাত বৃটেনে ২০২৫ সালের বসন্ত থেকে চলতি বছরের বসন্ত পর্যন্ত ৬১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৯ শতাংশ হয়েছে। জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামবিরোধী মনোভাবের জায়গায় তারা অভিন্ন অবস্থান খুঁজে পেয়েছে।

ইতালির রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাতালি তচ্চি জানান, জনচাপের কারণেই ইউরোপীয় দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া বা সহযোগিতা চুক্তি স্থগিতের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। চ্যাথাম হাউসের জুলি এম নরম্যান জানিয়েছেন, এখন ইউরোপের দেশগুলো কেবল মন্ত্রী পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের ওপর সরাসরি নজরদারি ও পর্যালোচনার কাঠামোগত পথে এগোচ্ছে। তবে জার্মানির মতো কিছু দেশে সরকার এখনো ইসরাইলকে কূটনৈতিক ও বস্তুগত সহায়তা দেওয়ার প্রশ্নে অটল রয়েছে, যা নিয়ে খোদ সে দেশের জনগণের মধ্যেও সমালোচনা রয়েছে। তিনি আরও লিখেছেন, ৭ই অক্টোবরের হামলা ইসরাইলের জনমতকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে, কোনো বিদেশি সরকার ইসরাইলের সমালোচনা করলেই ইসরাইলিরা মাত্র দুটি দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পান: হয় ওই সমালোচনা ইহুদিবিদ্বেষপ্রসূত, নয়তো সমালোচনাকারী অ। মধ্যপ্রাচ্য আমেরিকান ডায়ালগ ফোরামের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইয়াকভ কাটজ চ্যাথাম হাউসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘বিষয়টি নিয়ে প্রায় কোনো আলোচনাই হচ্ছে না।

ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেনাখেম ক্লেইন মনে করেন, বর্তমান সরকার মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের যে ক্ষতি করেছে, তা পুষিয়ে নিতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। ইসরাইলিরা নির্বাচনী বিতর্কে হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের শক্তি খর্ব করার ওপর জোর দিলেও, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং আইসিসির মতো সংস্থার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তাদের ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইয়োশি মেকেলবার্গের ভাষায়, শান্তি প্রক্রিয়ায় বাস্তব পদক্ষেপ না নিলে ইসরাইলের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের এই ক্ষত কখনোই পুরোপুরি সারবে না।