এক এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও নির্যাতন করা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে। জেআইসি বা ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিত এই গোপন বন্দিশালায় তাকে নির্যাতনের বিষয়টি বিভিন্ন সাক্ষীর বক্তব্যে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গতকাল এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। জেআইসি পরিদর্শন শেষে তিনি ‘আয়নাঘর’ নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলে ধরেন। ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানিয়েছে, দু’জন সাক্ষী এবং গ্রেপ্তার হওয়া দু’জন আসামির বর্ণনায় তারেক রহমানকে নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া গেছে। সাবেক এমপি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তদন্ত সংস্থায় জবানবন্দি দিয়েছেন যে, ডিজিএফআই কর্তৃক তারেক রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল।
শতাধিক গুম ও হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ট্রাইব্যুনালে তিনি জানান, ২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর বিতর্ক থেকে যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতেই দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছিল। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআই কার্যত দেশের মুখ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। আরেক সাক্ষী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, তাকে জেআইসির যে কক্ষে বন্দি রাখা হয়েছিল, সেই একই কক্ষে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও এনে নির্যাতন করা হয়েছিল। তিনি জানান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ২০০৭ সালের ৭ই মার্চ গ্রেপ্তার হন এবং তাকে দুইবার ডিজিএফআইয়ের জেআইসিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন করা হয়।
জেআইসির ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, চারটি স্থাপনার মধ্যে টিএফআই সেলকে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে মনে হয়েছে। তিনি বলেন, একজন মানুষকে যখন দিনের পর দিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়, সেটিই মানবতাবিরোধী অপরাধ। জেআইসিতে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৬টি স্থায়ী সেল ছিল। এর মধ্যে এক অংশের সেলগুলোর গড় আয়তন ছিল প্রায় ১৬ ফুট বাই ৬ ফুট এবং অন্য অংশের সেলগুলোর গড় আয়তন ছিল ১২ ফুট বাই ৮ ফুট। গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর এই জেআইসি ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পায়। বন্দিদের পরিচয় গোপন রাখতে বিভিন্ন শিল্পকর্মের নাম, যেমন ‘মোনালিসা’ কোডনেম হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, ৫ই আগস্ট ২০২৪-এর পর জেআইসির মূল কাঠামো ও আলামতের বড় একটি অংশ নষ্ট করা হয়েছে, যা গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
জেআইসি সেলের কাঠামোর বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কক্ষগুলো সাউন্ডপ্রুফ রাখার ব্যবস্থা ছিল যাতে ভেতরের কান্নার আওয়াজ বাইরে না যায়। সেখানে ভারী এক্সজস্ট ফ্যান ছিল এবং কোনো জানালা ছিল না। অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মানুষকে বন্দি রাখা হতো। তিনি আরও বলেন, কক্ষের আয়তন বড় বা ছোট হওয়া মুখ্য নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশের একজন নাগরিককে এভাবে বন্দি রাখা। শনিবার দুপুরে কাউন্টার টেরোরিজম ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (সিটিআইবি) অধীনে থাকা জেআইসি পরিদর্শনে যান ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ, বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী এবং রেজিস্ট্রার আবু সালেহ মোহাম্মদ রুহুল ইমরান।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো টিএফআই সেল বা ‘আয়নাঘর’ যেন আর প্রতিষ্ঠিত না হয়, সেই আহ্বান জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কোনো নাগরিক অপরাধ করলে তাকে আইনের আওতায় বিচার করতে হবে, কিন্তু বিচারবহিভূত হত্যাকাণ্ড বা গোপন বন্দিশালায় দিনের পর দিন আটকে রাখা অগ্রহণযোগ্য। তিনি জানান, বিগত সরকারের আমলে কিছু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সরকারের অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এসব টর্চার সেল তৈরি করেছিল। সেখানে রাজনৈতিক দল ও ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ ভিন্নমতের ব্যক্তিদের ধরে এনে আটকে রাখা হতো। অনেককে সেখান থেকে গুম করা হয়েছে, যাদের এখনো সন্ধান মেলেনি। ডিফেন্সের আইনজীবীদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা শেখ হাসিনার ভাষায় বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন, কিন্তু জাতিকে আর বিভ্রান্ত করার সুযোগ নেই।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, আমরা কোনো গোপন বিচার বা ক্যামেরা ট্রায়াল করছি না, বরং অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে বিচার কার্যক্রম চলছে। তৎকালীন সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্তদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেন একজন নাগরিককে আটক রাখা হয়েছিল এবং কেন এই আয়নাঘরের প্রয়োজন হয়েছিল, তার ব্যাখ্যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের দিতে হবে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে নির্যাতনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই গোপন বন্দিশালায় গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে। এতে ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালকসহ অন্যান্যদের নাম রয়েছে। এদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু সাক্ষী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আযমীর সাক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে দাবি করেছেন যে, পরিদর্শন করা কক্ষের দক্ষিণ দিকে জানালা রয়েছে, যা আযমীর বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক। তবে প্রসিকিউশন তাদের সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ছিলেন।
যা তিনি বন্দি থাকাবস্থায় তাকে খাবার সরবরাহ করা লোকদের কাছে শুনেছেন।
এ ছাড়া প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদকে তদন্ত সংস্থায় জিজ্ঞাসাবাদেও এ বিষয়ে তথ্য মিলেছে।
তখন তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে কমান্ড্যান্ট স্কুল অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সে কর্মরত ছিলেন।
যা জেআইসিতে রক্ষিত রেজিস্টারে নির্দিষ্টভাবে লেখা আছে।
তিনি আরও বলেন, কোন কক্ষ কতো বড় বা ছোট, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একজন নাগরিককে ২৪ ঘণ্টার বেশি আটকে রাখতে পারে না।
সেখানে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর কাউকে আটকে রাখার কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
এ ছাড়া প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মো.
আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, জহিরুল আমিন, ব্যারিস্টার শাইখ মাহদী ও তাসমিরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
ডিফেন্সের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন- আজিজুর রহমান দুলু, ব্যারিস্টার হামিদুল মিসবাহ, ব্যারিস্টার মাহিন রহমান এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি হিসেবে দৈনিক -এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
এখনো বহু গুমের শিকার ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
অনেক ভুক্তভোগীকে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে।
ভবিষ্যতে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদেরও এসব অমানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
শেখ হাসিনা যেমন যখন যা মন চায়, সেভাবে কথা বলেন, তাদের প্রতিনিধিরাও একইভাবে বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রায় ৩০ হাজার মানুষ অঙ্গহানি ও পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন, প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং ৪ হাজারের বেশি মানুষ গুম, খুন কিংবা কথিত ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন তথ্য রয়েছে।
প্রায় ২৫০ জনের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ইলিয়াস আলী, সুমনসহ বহু ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি নজির স্থাপন করবে বলে আমরা মনে করি।
মামলাটি বর্তমানে ট্রাইব্যুনাল-১ এ বিচারাধীন রয়েছে।
মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
৩ আসামির পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার হামিদুল মিসবাহ বলেন, জেআইসি ছিল সিটিআইবি-এর আওতাধীন।
জেলার যেমন সিদ্ধান্ত নেন না যে এখানে কাকে আনা হবে, কতোদিন রাখা হবে, কবে ছাড়া হবে।
আমার ক্লায়েন্টের ভূমিকাও একই রকমের ছিল।
তার দাবি, ট্রাইব্যুনালে আযমী বলেছেন, বন্দিশালায় থাকাকালে তিনি আলো-বাতাস, চন্দ্র-সূর্য ও গাছপালা কিছুই দেখেননি।
ডিফেন্স আইনজীবী বলেন, যে ব্যক্তি দাবি করেছেন তিনি গাছপালা দেখেননি, তার কক্ষের দু’টি জানালা দিয়ে যদি গাছপালা দেখা সম্ভব হয়, তাহলে তার সাক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এতে দিবালোকের মতো পরিষ্কার, মিস্টার আযমী মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন।
বন্দিশালাটিকে ‘আর্ট গ্যালারি’ নামে ডাকা হতো: প্রসিকিউশনের জেআইসি’র বর্ণনাসম্বলিত ডকুমেন্টে বলা হয়, ঢাকা সেনানিবাসে ডিজিএফআই সদর দপ্তর ও মেস-বি সংলগ্ন একটি দোতলা ভবনটিই ছিল জেআইসি।
দোতলা ভবনের নিচতলায় থাকা জেআইসি বন্দিশালাটি দুই অংশে বিভক্ত।
এসব সেলের দেয়াল সিমেন্ট দিয়ে এবড়ো-থেবড়োভাবে তৈরি করা।
কয়েকটি সেলে এক্সহস্ট ফ্যান, লোহার শিক ও কাঠের দরজা ছিল।
স্থাপনাটির নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ দায়িত্বে এমওডিসি ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত ছিলেন।
বন্দিদের চিকিৎসার জন্য ডিজিএফআইয়ের এমআই রুমে কর্মরত চিকিৎসক ও মেডিকেল এসিস্ট্যান্টরাও দায়িত্ব পালন করতেন বলে জানা গেছে।
তদন্তের সময় স্থাপনাটি পরিদর্শন করে দেয়াল, দরজা, জানালা ও অন্যান্য কাঠামোতে পরিবর্তন ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেছে।



