কক্সবাজারের উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী এলাকায় একটি বাড়িতে নলকূপ বসানোর সময় ভূগর্ভ থেকে গ্যাস নির্গমন ও আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। গত ২৭ অক্টোবর সকালে প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে পাইপ বসানোর সময় আকস্মিক গ্যাস বের হতে শুরু করে এবং দ্রুতই তাতে আগুন ধরে যায়। টানা পাঁচ দিন ধরে চলমান এই আগুন এখন এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। প্রাথমিক পর্যালোচনায় বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মাটির নিচে অগভীর গ্যাসের মজুত বা শ্যালো রিজার্ভার থেকে এই আগুন জ্বলছে। দেশে সাধারণত ভূগর্ভের দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরে গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে গ্যাস মজুতের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর সকালে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের ইনানী ছোট খাল ব্রিজসংলগ্ন একটি বাড়িতে নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল।
গ্যাসের শিখার রঙ ও ধরন দেখে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সেখানে শুধু গ্যাস নয়, বরং তেল বা কনডেনসেট থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন ও মাইনস) প্রকৌশলী শোয়েব জানান, বিষয়টি নিশ্চিত হতে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা যৌথভাবে কাজ করছেন। বৃহস্পতিবার পেট্রোবাংলায় আয়োজিত এক সভায় অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপকদের নিয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। নির্গত গ্যাস থার্মোজেনিক ও বায়োজেনিক উভয় প্রকৃতির হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যানবাহন নিয়ে চলাচলেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে বাপেক্স ও পেট্রোবাংলা আগামী ১৫ দিন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আগুনের তীব্রতা না কমলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি বিকল্প বা ‘রিলিফ কূপ’ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুকতাদির জানান, এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা বাপেক্সের রয়েছে। তবে নিরাপত্তার খাতিরে খুব সতর্কতার সঙ্গে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে রিলিফ কূপ খননের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) উচ্চ পর্যায়ের একটি দল। তারা ইতোমধ্যে নানা ধরনের নমুনা সংগ্রহ করেছেন এবং তা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। মো. শোয়েবের মতে, আশপাশের কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকেও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে। পরে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১৫ দিনের পর্যবেক্ষণ শেষে যদি আগুনের তেজ না কমে, তবে সাইড ট্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে রিলিফ কূপ খনন করে গ্যাস নির্গমন বন্ধের চেষ্টা করা হবে। এছাড়া বাপেক্স সেখানে ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি ভূকম্পন জরিপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদি জরিপে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হওয়া যায়, তবেই নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এটি দেশের ৩১তম খনিজ কূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে গ্যাসের উৎস ও প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে।
ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সভায় এলাকাটিকে বিভিন্ন নিরাপত্তা জোনে ভাগ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এরপর উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তারের আদেশে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এই এলাকায় জনসমাগম, ধূমপান বা আগুন জ্বালানোর মতো যেকোনো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এমন কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল ও আশপাশে আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দিয়াশলাই বা লাইটার ব্যবহারসহ স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে- এমন সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে এলাকায় মাইকিংয়ের পাশাপাশি কাঁটাতারের বেড়া ও লাল পতাকা বসানো হয়েছে। তবে এত কিছুর পরও উৎসুক মানুষের ভিড় থামানো যাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দা ছৈয়দ আলম জানান, বাপেক্সের পক্ষ থেকে শুরুতে ৭২ ঘণ্টার সময় দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আগুনের তীব্রতা কমেনি। বেলাল উদ্দিন নামে আরেক বাসিন্দা জানান, আগুনের কারণে রাস্তার দুই পাশের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কাও। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ১৪৪ ধারা জারির পরও প্রতিদিনই বিকালে ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড় বেড়ে যাচ্ছে।
শহিদুল আলমসহ স্থানীয় কয়েকজন আক্ষেপ করে জানান, প্রশাসন তিন দিন পর ১৪৪ ধারা জারি করলেও উৎসুক জনতা তা মানছেন না। নিয়মিত ভিড়ের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বর্তমানে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর ইউনিটগুলোও সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।



