পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো নিয়ে সোচ্চার ভারতের বিশিষ্ট নাগরিকরা

, বিশ্ব

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো নিয়ে সোচ্চার ভারতের বিশিষ্ট নাগরিকরা

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চলে আইনি সুরক্ষা উপেক্ষা করে বাংলাভাষী মুসলিম নাগরিকদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভারতের বিশিষ্ট নাগরিক ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ রাতের আঁধারে সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপারে পাঠানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, যা সীমান্তে এক নতুন মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। এতে দুই দেশের সীমান্তসংলগ্ন জিরো লাইনে এক অনাকাঙ্ক্ষিত মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এটিকে সারা ভারতের সাধারণ নাগরিক, সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বাংলা এই মতের সবচেয়ে অগ্রণী ধারক ও বাহক হিসেবে পরিচিত।

এই পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য গঠিত সাত সদস্যের একটি জুরিবোর্ড কলকাতায় দুদিনের এক ‘পিপলস ট্রাইব্যুনাল’ পরিচালনা করেছে। এই বোর্ডে রয়েছেন জহর সরকার, হর্ষ মান্দার, আকার প্যাটেল, ওয়াজাহাত হাবিবুল্লাহ, জন দয়াল, বিদ্যা দিনকর ও তনিকা সরকার। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য গ্রহণের পর মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তারা উদ্বেগজনক সব তথ্য তুলে ধরেন। সমস্যা গভীরে গিয়ে বোঝার জন্য এবং সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী অত্যাচারিত মানুষের দুর্দশার কথা শোনার জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। ভারতের বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মান্দারের ‘কারওয়া-এ-মহব্বত’, কলকাতার ‘সাবার ইনস্টিটিউট’ এবং ‘আমরা এক সচেতন প্রয়াস’-এর যৌথ উদ্যোগে কলকাতায় আয়োজিত দুই দিনের ‘পিপলস ট্রাইব্যুনাল’-এ (জনতার ট্রাইব্যুনাল) ভুক্তভোগী ও মানবাধিকারকর্মীরা তাঁদের সাক্ষ্য ও। কিন্তু এত দিনেও সেই দাবির স্বপক্ষে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের পরিচয় সামনে আনা যায়নি।’। আকার প্যাটেল বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, এমন দিনও আমাদের দেখতে হচ্ছে।

সাবেক আইএএস কর্মকর্তা ও রাজ্যসভার সাবেক সদস্য জহর সরকার বিজেপি সরকারের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, রাজ্যে দেড় কোটি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী থাকার কথা বলা হলেও তার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। তিনি বরং সাধারণ ভোটারদের নিগ্রহ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এদিকে অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার সাবেক প্রধান আকার প্যাটেল মন্তব্য করেন, ভারতের সাংবিধানিক সহিষ্ণুতা আজ পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ঘটনায় চরম আঘাতের মুখে। একই সঙ্গে এসআইআরের নামে সাধারণ ভোটারদের ভোগান্তি, মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নিগ্রহ এবং নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জহর সরকার। প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেও যখন বিদেশ সফরে যান, তখন এই কারণে তিনি প্রশংসিত হন। সরকারের এই আচরণ প্রকারান্তরে হিংসায় ইন্ধনই জোগাচ্ছে। রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে খ্রিষ্টান উপাসনালয়, গির্জা ও মিশনারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর হামলা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন স্থানে প্রার্থনা সভা চলাকালে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে হামলা, গির্জা ভাঙচুর এবং যাজকদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে।

তদন্তকারী প্রতিবেদনে মুর্শিদাবাদের সুতি এলাকার বাসিন্দা ডাবলু শেখ ও তাঁর সন্তানদের উদাহরণ উঠে এসেছে। পরিবারটির দাবি, ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকা এবং নিয়মিত নির্বাচনে ভোট দেওয়া সত্ত্বেও যথাযথ তদন্ত ছাড়াই তাঁদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া উত্তর দিনাজপুর জেলার ৭৬ বছর বয়সী জলিল আখতারকে তিন দশকের ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ৮৭ দিন আটকে রাখা হয়েছিল এবং দুবার বাংলাদেশে বহিষ্কারের চেষ্টা করা হয়। পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, ডাবলু শেখের বাবার নাম ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত ছিল এবং ডাবলু শেখ নিজে ২০২৬ সালের নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন। একইভাবে জলিল আখতার নামের ৭৬ বছর বয়সী পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার এক প্রবীণ নাগরিকের ঘটনা রাজ্যজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

ট্রাইব্যুনালের সদস্যরা জানান, পর্যাপ্ত নথি ছাড়া স্থানীয় হোল্ডিং সেন্টার বা ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রেখে মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার একাধিক ঘটনা তাদের কাছে নথিভুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও মানবাধিকার সংস্থা ‘মাসুম’-এর অনুসন্ধানে সীমান্ত এলাকার এই করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। এই অনানুষ্ঠানিক ট্রাইব্যুনালের প্রথম শুনানি হয় গত মঙ্গলবার কলকাতার প্রেসক্লাবে।

সংখ্যালঘু নিগ্রহের তালিকায় মুসলিমদের পাশাপাশি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ও রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, নতুন শাসনামলের গত ছয় মাসে রাজ্যে ৬৮টি ধর্মীয় আক্রমণ ও চরমপন্থার ঘটনা ঘটেছে। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা এফআইআর দায়ের করতে গিয়েও পুলিশি অবহেলার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পশ্চিম বর্ধমানের শালানপুর, দুর্গাপুর এবং উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জ ও মেদিনীপুরে খ্রিষ্টান যাজক ও মিশনারি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার পেছনে হিন্দু জাগরণ মঞ্চ ও বজরঙ্গ দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। মামা জশুয়া ও অনুপ কুমার ঘোষসহ একাধিক যাজকের ওপর হামলার ঘটনাগুলো উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সবশেষে, স্থানীয় নির্বাচনের স্বচ্ছতা ফেরাতে কলকাতা ও হাওড়া মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন এলাকায় ত্রুটিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভোটার তালিকা থেকে নাম ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের সদস্যরা। অবিলম্বে এই পরিস্থিতির অবসানে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তাঁরা।