যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের বড় সমর্থন পেয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টি ভূমিধস জয় পেয়েছে। তবে এই সাফল্যের পরই তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের সংসারের খরচ কমিয়ে স্বস্তি ফেরানো। মূলত উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণেই রিপাবলিকানরা নির্বাচনী বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে, আর এখন ডেমোক্র্যাটদেরও একই সমস্যার মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আমেরিকানরা নিত্যপণ্যের দাম কমানোর আশা করলেও নীতিনির্ধারকদের জন্য রাতারাতি তা কার্যকর করা বেশ জটিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও কয়েক বছরের জমে থাকা মূল্যবৃদ্ধি পুরোপুরি আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা কঠিন। কারণ, এ ধরনের ব্যাপক মূল্যপতন কর্মসংস্থান কমিয়ে দিতে পারে এবং মানুষের আয় কমিয়ে অর্থনীতির ক্ষতি করতে পারে। তাই নতুন ডেমোক্রেট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভায় দলটির প্রতিনিধিদের জন্য এটিই এখন প্রধান অগ্নিপরীক্ষা। ভোটারদের পারিবারিক বাজেটে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে তাদের কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাজেট ও নীতি অগ্রাধিকারবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি প্রায়োরিটিজ’-এর ফেডারেল বাজেট নীতির জ্যেষ্ঠ পরিচালক ব্রেন্ডান ডিউক বলেন, মূল্যবৃদ্ধি পুরোপুরি আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অনেক ধাক্কা সামলানো সম্ভব। তার মতে, খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে কাটছাঁট প্রত্যাহার, স্বাস্থ্যবিমায় ভর্তুকি পুনর্বহাল এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান সাধারণ মানুষের ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে। তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্মতি পাওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় একটি শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বেকারত্ব বৃদ্ধি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বিনিয়োগ-বুদ্বুদ ফেটে যাওয়ার মতো অর্থনৈতিক ঝুঁকি মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সংকটকে আরও আড়াল করে দিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। কী বলছেন অর্থনীতিবিদরা সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি প্রায়োরিটিজের (বাজেট ও নীতি অগ্রাধিকারবিষয়ক গবেষণা সংস্থা) ফেডারেল বাজেট নীতির জ্যেষ্ঠ পরিচালক ব্রেন্ডান ডিউক অ্যাক্সিওসকে বলেন, ‘দাম ২০১৯ সালের পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা সম। তাদের কেউ কেউ খাদ্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথাও বলেছেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ এখনো ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে। এতে আমদানি করা পণ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় কমতে পারে।
ডেমোক্রেটদের ক্ষমতা ও কৌশল নিয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নির্বাচনের পর বাজারে কিছুটা স্বস্তি মিললেও জ্বালানি তেলের দাম ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। এছাড়া কংগ্রেস শুল্ক প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাতে ভেটো প্রয়োগ করতে পারেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুল্ক কমার সুবিধা ভোক্তাদের দেবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই। স্বাস্থ্যসেবা আইন ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’ বা মেডিকেইডের মতো কর্মসূচিতে কাটছাঁট প্রত্যাহারও ডেমোক্রেটিক দলীয় অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য বা ট্রাম্পের বিরোধিতার কারণে থমকে যেতে পারে। ফলে যে স্বস্তি দেয়ার চেষ্টা, শেষ পর্যন্ত তাতে পরিবারগুলো আগের চেয়েও খারাপ অবস্থায় পড়তে পারে। ডেমোক্রেটদের ক্ষমতা সীমিত পারিবারিক ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টিকারী বিভিন্ন কারণ মোকাবিলায় ডেমোক্রেটদের ক্ষমতা সীমিত। ফলে জ্বালানির দামে আরও স্বস্তি আসবে কিনা, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে তার সিদ্ধান্তের ওপর।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে অনেক ডেমোক্র্যাট প্রার্থী নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার করেছিলেন। যেমন, টেক্সাসের জেমস তালারিকো শুল্ক প্রত্যাহার ও বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আবার নর্থ ক্যারোলাইনার রয় কুপার সবকিছুর দাম কমানোর আশ্বাস দিয়েছেন। সাউথ ক্যারোলাইনার অ্যানি অ্যান্ড্রুজ ফেডারেল গ্যাস কর সাময়িকভাবে স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে সরাসরি অর্থ সহায়তার পরিকল্পনাও রয়েছে; যেমন টেক্সাসের নবনির্বাচিত গভর্নর জিনা হিনোজোসা ১ হাজার ৫০০ ডলারের রিবেট চেক দেয়ার প্রস্তাব করেছেন।
তবে এসব উদ্যোগ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। ডাবললাইন ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী জেফ গান্ডলাখ এক্সে এক পোস্টে মন্তব্য করেছেন, ডেমোক্র্যাটদের কাছে এখন ‘সাশ্রয়ী জীবনযাপন’ একটি বড় দায়িত্ব। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত দাম কমাতে কোনো জাদুর কাঠি নেই; আবার মানুষকে টাকা দিলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে দ্রুত মজুরি বৃদ্ধির মাধ্যমেই মূলত ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার সম্ভব, তবে সেই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের হাতে থাকায় এবং কংগ্রেসে ভেটো ঠেকানোর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় অর্থনীতি নিয়ে সব দায় ডেমোক্র্যাটদের ওপরই বর্তাবে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে ডেমোক্র্যাটদের এখনই দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।



