জাতীয় নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভোটের মাঠে সন্ত্রাস ও সহিংসতার আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন স্তরে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, কিন্তু বাস্তবতায় সেই চিত্র এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। ভয়হীন ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত অবৈধ অস্ত্রধারী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের আহ্বান জানিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি রাজধানীতে ফিল্মি কায়দায় এক রাজনৈতিক কর্মীকে গুলি করার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এর আগে চট্টগ্রামে নির্বাচনী জনসংযোগকালে এক প্রার্থীর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় প্রার্থীদের স্বাভাবিক প্রচার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের শুরুতেই যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে দিন যত গড়াবে পরিস্থিতি তত জটিল ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠতে পারে। এজন্য আগাম গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও তৎপর হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোটের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার আগেই পরিস্থিতি উন্নত করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সারা দেশে পুলিশকে সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনার কথাও ভাবা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নির্বাচনের পরিবেশের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তার মতে, অস্ত্র উদ্ধারে দৃশ্যমান ও কার্যকর অভিযান না হওয়ায় অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হতে পারে। নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো জরুরি।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকা অপরিহার্য। বর্তমানে পরিস্থিতি খুব খারাপ না হলেও পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। যাতে পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
গত কয়েক মাসের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধের প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে দেশে খুনের মামলা বেড়েছে। একই সঙ্গে ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ ও চুরির ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন রেঞ্জ ও মহানগর এলাকায় হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টিও পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানা ও পুলিশ স্থাপনা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, যা নির্বাচন সামনে রেখে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ভোটের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে এখনই দৃঢ় ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।