প্রতিবেদন রুবেল তালুকদার
জেলা প্রতিনিধি সিরাজগঞ্জ
একসময় রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ, আলোচনা অনুষ্ঠান, সংবাদ সম্মেলন কিংবা আনুষ্ঠানিক আয়োজনে সংবাদ কাভারেজের জন্য আমন্ত্রিত সাংবাদিকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দের রীতি ছিল। আলাদা এই টেবিল বা নির্ধারিত জায়গাটি পরিচিত ছিল ‘প্রেস টেবিল’ নামে। এটি শুধু বসার স্থান নয়, বরং সাংবাদিকদের পেশাগত পরিচয়, মর্যাদা ও নিরাপত্তার একটি স্বীকৃত কাঠামো ছিল।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাটি অনেকটাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক আয়োজনে প্রেস টেবিলের অনুপস্থিতি সাংবাদিকতার জন্য এক ধরনের নীরব সংকটে পরিণত হয়েছে। অথচ প্রেস টেবিল কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দল-নিরপেক্ষ সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও পেশাগত মর্যাদার প্রতীক।
বর্তমানে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সংবাদকর্মীরা বাধ্য হচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড়ে, কখনো মঞ্চের একেবারে পাশে, কখনো কর্মীদের সঙ্গে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে। এতে একজন সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তেমনি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য এমন পরিবেশ একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের জন্য বিব্রতকর, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অবমাননাকর।
রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সংবাদ কাভারেজ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হেনস্তা, বিদ্বেষমূলক আচরণ এবং শারীরিক আক্রমণের শিকার হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে একই সারিতে অবস্থানের কারণে অনেক সময় সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও এমনভাবে ধারণ করা হয়, যা পরবর্তীতে তাদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে একটি স্থিরচিত্র বা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওই একজন সাংবাদিককে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে উপস্থাপন করতে যথেষ্ট। বাস্তবে নিরপেক্ষ থাকলেও এসব বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার দায় শেষ পর্যন্ত সাংবাদিককেই বহন করতে হয়।
বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলের কর্মী না হয়েও শুধুমাত্র কোনো ফ্রেমে বা ভিডিওতে উপস্থিত থাকার কারণে বহু সাংবাদিক হামলা, মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নয়, বরং এটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্যও অশনিসংকেত।
রাজনৈতিক আয়োজনে যদি সাংবাদিকদের জন্য নির্দিষ্ট ‘প্রেস টেবিল’ বা আলাদা মিডিয়া জোন নিশ্চিত করা হতো, তাহলে এ ধরনের বিপর্যয়ের অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো। এতে সংবাদ সংগ্রহ হতো সুশৃঙ্খল ও পেশাদার পরিবেশে, পাশাপাশি সাংবাদিকদের দলীয় পরিচয়ের অপবাদ থেকেও মুক্ত রাখা যেত।
প্রেস টেবিল সাংবাদিক ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর পেশাদার দূরত্ব তৈরি করে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অত্যন্ত জরুরি। এই দূরত্ব সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকেও গণমাধ্যমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে উৎসাহিত করে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
এখনো দেশে বহু দল-নিরপেক্ষ সাংবাদিক রয়েছেন, যারা কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন বা সহযোগী শক্তির সঙ্গে যুক্ত না থেকেও সততা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাদের কাছে রাজনৈতিক আয়োজনে এ ধরনের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা চরম হতাশাজনক।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বিনীত আহ্বান—গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ কিংবা সুবিধাভোগী হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করুন। সাংবাদিকরা কোনো দলের মুখপাত্র নন, আবার শত্রুও নন। তারা সমাজের দর্পণ, যেখানে সত্যের প্রতিফলন ঘটে।
আশা করা যায়, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন এবং ভবিষ্যতে সকল রাজনৈতিক আয়োজনে গণমাধ্যমের জন্য আলাদা প্রেস টেবিল বা নির্ধারিত স্থান নিশ্চিত করবেন। এটি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি একটি সুস্থ, সহনশীল ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
সবশেষ কথা—প্রেস টেবিল কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সাংবাদিকতার ন্যূনতম অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করা মানেই গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা।
এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন—
নির্যাতিত সাংবাদিক রুবেল তালুকদার
জেলা প্রতিনিধি, সিরাজগঞ্জ
দৈনিক আজকের দেশ বাংলা