গতকাল বুধবার ছিল বিশ্ব হাতি দিবস। প্রতিবছর এই দিনটিতে স্থলভাগের এই বিশাল ও শান্ত প্রাণীকে ভালোবাসার এবং তাদের সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। বিজ্ঞানের চোখে হাতি কেবল একটি বিশাল প্রাণীই নয়, এটি মূলত বিবর্তনের এক অবিশ্বাস্য বায়ো-প্রযুক্তিগত বিস্ময়। হাতির শুঁড়কে প্রকৃতির সবচেয়ে অদ্ভুত ‘সুইস আর্মি নাইফ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, কারণ এটি দিয়ে নানাবিধ কাজ করা সম্ভব।
হাতির শুঁড়কে প্রকৃতির বিস্ময় বলার পেছনে রয়েছে এর অনন্য গঠন। মানুষের পুরো শরীরে হাড় ও পেশি মিলিয়ে মোট পেশির সংখ্যা ৬০০টির কিছু বেশি। কিন্তু হাতির শুঁড়ে কোনো হাড় বা তরুণাস্থি নেই; এটি পুরোপুরি পেশি দিয়ে গঠিত। হাতির শুঁড়ে প্রজাতিভেদে প্রায় ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজারটি ভিন্ন ভিন্ন পেশিকলা থাকে। এই অসাধারণ গঠনের কারণেই হাতি তার শুঁড় দিয়ে টনের বেশি ওজনের বিশাল গাছের গুঁড়ি যেমন উপড়ে ফেলতে পারে, তেমনি একদম সূক্ষ্ম স্পর্শে মাটি থেকে একটা পুদিনাপাতা বা ছোট্ট চিপস ভেঙে না ফেলে আলতো করে তুলে নিতে পারে।
হাতির শুঁড়কে অনেকে সুপারসনিক পানির পাম্পের সঙ্গে তুলনা করেন। বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, হাতির শুঁড় প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫০ মিটার বেগে বাতাস টানতে পারে। তুলনামূলকভাবে, মানুষ হাঁচি দিলে ঘণ্টায় প্রায় ৪.৫ কিলোমিটার গতিতে বাতাস বের হয়। অর্থাৎ, হাতি তার চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ বেশি গতিতে শুঁড় দিয়ে পানি বা বাতাস টেনে নিতে পারে। এক টানে হাতি প্রায় ৮ থেকে ৯ লিটার পানি শুঁড়ের ভেতর ধরে রাখতে সক্ষম। তবে হাতি শুঁড় দিয়ে সরাসরি পানি পান করে না, বরং শুঁড়ে পানি টেনে এনে তা পাইপের মতো মুখে ঢেলে দেয়।
হাতির শুঁড় মূলত তাদের নাক এবং ওপরের ঠোঁটের এক অসাধারণ বিবর্তিত রূপ। আফ্রিকান হাতির শুঁড়ের একদম মাথায় দুটো এবং এশিয়ান হাতির মাথায় একটি আঙুলের মতো সংবেদনশীল অংশ থাকে, যা দিয়ে তারা স্পর্শ অনুভূতি লাভ করে ও নিখুঁতভাবে বস্তু ধরতে পারে। এছাড়া হাতি কেবল কান দিয়ে শোনে না, তারা পায়ের পাতা দিয়েও সংকেত গ্রহণ করে। যখন কোনো হাতি হুঙ্কার দেয় বা মাটিকে আঘাত করে, তখন ভূকম্পন তরঙ্গ তৈরি হয়। দূরবর্তী অন্য হাতিরা তাদের পায়ের সংবেদনশীল স্নায়ুর মাধ্যমে মাটির সেই কম্পন অনুভব করে বুঝতে পারে বন্ধু নাকি শত্রু আসছে।
আফ্রিকা ও এশিয়ায় বসবাসকারী হাতিদের মধ্যে প্রজাতি ও শারীরিক গঠনে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আফ্রিকার হাতি আকৃতিতে বড় হয় এবং এদের দুটি প্রজাতি রয়েছে—আফ্রিকান সাভানা হাতি ও আফ্রিকান ফরেস্ট হাতি। আফ্রিকান সাভানা হাতি বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণী, যাদের উচ্চতা ১০ থেকে ১৩ ফুট এবং ওজন ৩৬০০ থেকে ৬ হাজার ৪০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। এদের কান অনেক বড় হয় এবং পুরুষ ও স্ত্রী উভয় হাতিরই বড় দাঁত থাকে। অন্যদিকে, এশিয়ান হাতি এশিয়ার বনাঞ্চলে থাকে। এই হাতিগুলোর কান অপেক্ষাকৃত ছোট ও গোলাকার। এদের উচ্চতা ৬.৫ থেকে ১১.৫ ফুট এবং ওজন প্রায় ৫ হাজার কেজি হয়। এদের কেবল কিছু সংখ্যক পুরুষ হাতির পূর্ণাঙ্গ বড় দাঁত গজায়, বাকিদের ছোট ছোট গজদাঁত থাকে।
হাতি সাধারণত নারী হাতির নেতৃত্বে গঠিত দলে বা পরিবারে বাস করে। সবচেয়ে বয়স্ক অভিজ্ঞ নারী হাতি দলনেতা হিসেবে খাদ্যের উৎস ও নিরাপদ পথ খুঁজে বের করে। পুরুষ হাতি বয়ঃসন্ধিকালে দল ছেড়ে একা বা ছোট পুরুষ দলে বসবাস শুরু করে। এই সামাজিক কাঠামো এবং শারীরিক সক্ষমতা হাতিকে প্রকৃতির এক অনন্য প্রাণীতে পরিণত করেছে।



