ডিজিটাল অর্থনীতিতে গতি আনতে স্পেকট্রাম নীতি ও মূল্য পুনর্মূল্যায়নের তাগিদ

, তথ্য-প্রযুক্তি

ডিজিটাল অর্থনীতিতে গতি আনতে স্পেকট্রাম নীতি ও মূল্য পুনর্মূল্যায়নের তাগিদ

স্পেকট্রামকে কেবল সরকারি রাজস্ব আদায়ের মাধ্যম হিসেবে না দেখে জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে স্পেকট্রামের দাম অনেক বেশি। উন্নত ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে বিশ্বের অনেক দেশই স্পেকট্রামের মূল্য অর্ধেক বা তার চেয়েও বেশি কমিয়েছে। তাই বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা ও সাশ্রয়ী মূল্যে অধিক স্পেকট্রাম বরাদ্দ ডিজিটাল অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম ও আইটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারী (অব.)। টিআরএনবি সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন এমটব প্রেসিডেন্ট ও রবি আজিয়াটার সিইও জিয়াদ সাতারা, বাংলালিংকের সিইও ইয়োহান বুসে, গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান, এমটব মহাসচিব লে. কর্নেল মোহাম্মদ জুলফিকার, বাংলালিংকের চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার তাইমুর রহমান, গ্রামীণফোনের চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ, রবি আজিয়াটার চিফ কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম এবং এফআইসিসিআই এক্সিজিউটিভ ডিরেক্টর টিআইএম নূরুল কবীর। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এমডি মুনির হাসান এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন টিআরএনবির সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইন।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, টেলিকম খাতের সিদ্ধান্তগুলো অযৌক্তিক হওয়া চলবে না। নেটওয়ার্কের মান, ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক মডেল এবং গ্রাহকের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি সংশ্লিষ্টদের উদ্বিগ্ন না হয়ে জনগণের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারী জানান, স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তের বদলে গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ভিত্তি করা হবে। তিনি বলেন, আগামী নভেম্বরে বড় পরিসরের স্পেকট্রাম নবায়নের বিষয়টি সামনে রেখে একতরফা নয়, বরং অংশীদারিত্বমূলক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বর্তমানে দেশে ৪৬০ থেকে ৪৬২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আগামী বছর আরও ৪০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিলামের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গের প্রয়োজন হবে, যেখানে বিশ্বমান অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ গ্রাহকের জন্য ২ থেকে ৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গ দরকার, কিন্তু বাংলাদেশে এই হার মাত্র ২ দশমিক ২৯ মেগাহার্টজ।

এমটব প্রেসিডেন্ট জিয়াদ সাতারা বলেন, স্পেকট্রামের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত এর মাধ্যমে সৃষ্ট সংযোগ, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে। অতিরিক্ত মূল্য অপারেটরদের মূলধন বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত সেবার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলালিংক সিইও ইয়োহান বুসে উল্লেখ করেন, গত দশ বছরে টেলিকম খাতে খরচ বাড়লেও প্রবৃদ্ধি বাড়েনি। সাশ্রয়ী স্পেকট্রাম বরাদ্দ পেলে সেবার মান ও বিনিয়োগ উভয়ই বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান বলেন, স্পেকট্রাম নবায়নের বিষয়টি বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন। তিনি জানান, ভয়েস কলের মিনিট ২৫ শতাংশ কমেছে এবং এআরপিইউ (ARPU) অপরিবর্তিত রয়েছে। গত পাঁচ বছরে জাতীয় রাজস্বে অবদান বাড়লেও বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন কমেছে। এই বাস্তবতায় অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতা বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে সরকারকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।