সম্প্রতি মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংযোজন ঘটেছে। ড. খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং শামা ওবায়েদ ইসলাম পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে রয়েছেন। এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার রাজনৈতিক স্তরে এখন তিনজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি যুক্ত হলেন। এই কাঠামোগত পরিবর্তন কি বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য সময়োপযোগী, নাকি এটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভারী—সেই প্রশ্নটি এখন কূটনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
কূটনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট
পররাষ্ট্রনীতি এখন আর কেবল আনুষ্ঠানিক সফর, যৌথ বিবৃতি বা রাষ্ট্রদূতদের পরিচয়পত্র গ্রহণের মতো প্রথাগত কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় কূটনীতি মানেই নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, জলবায়ু, প্রযুক্তি এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মতো বহুমুখী বিষয়ের সমন্বয়। একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষে এককভাবে সব অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কৌশলগত বিষয়গুলো সমানভাবে তদারক করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে জাতিসংঘ, বিমসটেক, সার্ক, ওআইসি এবং কমনওয়েলথের মতো বড় প্ল্যাটফর্মগুলোতে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের অবস্থান
- ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি একাধিক প্রতিমন্ত্রী রাখার দীর্ঘদিনের রীতি রয়েছে, যা তাদের কূটনৈতিক কার্যক্রমকে গতিশীল রাখে।
- যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে অঞ্চল ও বিষয়ভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়।
- পাকিস্তানের ক্ষেত্রে কখনো পূর্ণ মন্ত্রী, আবার কখনো বিশেষ সহকারীর মাধ্যমে কাজের ভাগাভাগি দেখা গেছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি ভিন্ন উদাহরণ হতে পারে।
- নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলোতে তুলনামূলক ছোট রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালিত হওয়ার নজির রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই কাঠামোটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে কারণ দেশটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বিশাল বাজার, তৈরি পোশাকশিল্পের সক্ষমতা এবং বিপুল প্রবাসী জনগোষ্ঠী বাংলাদেশকে আঞ্চলিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক বজায় রাখা এখন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কৌশলগত পরীক্ষা।
সফল কূটনীতির শর্তসমূহ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে রাষ্ট্রীয় কূটনীতির প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত, দায়িত্বের লিখিত ও প্রকাশ্য বিভাজন নিশ্চিত করতে হবে। কে কোন অঞ্চল বা সংস্থা দেখবেন তা অস্পষ্ট থাকলে একই মন্ত্রণালয় থেকে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। পররাষ্ট্রনীতিতে “এক রাষ্ট্র, এক অবস্থান, এক বার্তা” নীতিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সম্পর্কের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে, যাতে সমান্তরাল কূটনীতি পরিচালনার সুযোগ না থাকে।
অর্থনৈতিক কূটনীতি ও জাতীয় লক্ষ্য
বাংলাদেশের কূটনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব” নীতিকে কেবল ঐতিহাসিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবভিত্তিক কৌশলগত বহুমুখিতায় রূপান্তর করা। এর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানো মানেই চীনবিরোধী অবস্থান নয়, আবার চীনের বিনিয়োগ গ্রহণ মানেই ভারতকে উপেক্ষা করা নয়। এছাড়া, এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি সুবিধা ধরে রাখা, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং দক্ষ কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল রাজনৈতিক পদ বাড়ালেই সক্ষমতা বাড়ে না; দূতাবাসের সেবা, পাসপোর্ট ইস্যু এবং প্রবাসী শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চাকরির আরও তথ্য: একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির সীমারেখা এখন প্রায় অদৃশ্য। চাকরির আরও তথ্য: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, বিমসটেক, সার্ক, ওআইসি, কমনওয়েলথ কিংবা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, রাশিয়া, তুরস্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিচালনা করতে হয়। চাকরির আরও তথ্য: একই সময়ে রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্ত পরিস্থিতি, তিস্তার পানি, বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, এলডিসি উত্তরণ, শুল্ক সুবিধা, শ্রমবাজার এবং প্রবাসীদের অধিকার নিয়েও কাজ করতে হয়। চাকরির আরও তথ্য: তাই একাধিক রাজনৈতিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দেয়া বিশ্বে অস্বাভাবিক নয়। চাকরির আরও তথ্য: ভারতের বিশালতা বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনীয় না হলেও প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির কাঠামো দেখায় যে আধুনিক কূটনীতিতে দায়িত্বের বিশেষায়ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। চাকরির আরও তথ্য: তাঁদের দায়িত্বও অঞ্চল ও বিষয়ভিত্তিক ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইন্দো-প্যাসিফিক, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, মানবাধিকার এবং কনস্যুলার বিষয় আলাদাভাবে বণ্টিত থাকে। চাকরির আরও তথ্য: জাপানেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সহায়তা করেন একাধিক স্টেট মিনিস্টার ও পার্লামেন্টারি ভাইস মিনিস্টার।



